রাষ্ট্রের ধর্মবাসনা, দলের ভণ্ডামি, জামায়াত নেতৃত্বের গ্রেফতার ও অন্যান্য প্রশ্ন

১.

আধুনিক রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, রাষ্ট্রের ধর্মাকাঙক্ষা থাকবে, ফলত সুযোগ পেলেই এটি নিজেরে পোপ ঘোষণা করবে এবং ধর্মের অবস্হান নিয়ে নেবে।  রাষ্ট্রের এই ধর্মবাসনা ক্ষমতা ও তার প্রয়োগে, এবং তার প্রকৃতি সেক্যুলার, কিন্তু ধর্মের যাবতীয় চরিত্র গ্রহণ করার চেষ্টা করে।  রাষ্ট্রের এই ধর্মভাব দেখা যাবে ট্রুথ কমিশন গঠন করে নাগরিকের কনফেশন ও আনুগত্য আদায়ের কাঙক্ষা এবং একটি টোটালিটারিয়ান পরিস্হিতি- যেখানে রাষ্ট্রই চূড়ান্ত বিধিদাতা, দমন-নিপীড়ন এবং নো টলারেন্স নীতি এইরকম কিছু উদাহরণে।  অন্যদিকে মানুষের ধর্মবোধ আছে, তাই মানুষ ধর্মাচরণ করে।  মানুষের এই ধর্মাচরণের চরিত্র সেক্যুলার নয়।  তাই সেক্যুলার রাষ্ট্রের এই ধর্মানুভূতি ও ধর্মাকাঙক্ষার বিরুদ্ধে নিরন্তর জেহাদ জারি রাখে ধর্মবোধসম্পন্ন মানুষেরা, তা যে রূপেই তার প্রকাশ ঘটুক।  এই জেহাদের পোশাকে ধর্ম থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে।

 

২.

ধর্মনিরপেক্ষ বলে কথিত একটি দলের ধর্মানুভূতি যখন পোপ বা কাঠমোল্লার চেয়েও প্রখর বোধ হচ্ছে বাংলাদেশে- যথা ধর্মানুভূতিতে আঘাত- রাষ্ট্রের কথিত ধর্মাকাঙক্ষার সাথে এর মিল-অমিলগুলোর ভাব-বিশ্লেষণ করা দরকার।  আধুনিক রাষ্ট্রের যে বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হল সেখানে লক্ষণীয়- ধর্মকে ব্যবহার করা হোক বা না হোক- রাষ্ট্র নিজেই ধর্মের জায়গা দখল করে ধর্মীয় অবস্হান নেওয়ার চেষ্টা করে।  তখন রাষ্ট্র হয় নিপীড়ক।  এবং রাষ্ট্র তখন হয় ধর্মের প্রতিদ্বন্ধী- ধর্মের সহায়ক নয়।  কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ বলে কথিত দলটির ধর্মানুভূতির উগ্রতা এবং তার কঠোর প্রয়োগের প্রতি একটু তীক্ষ্ন দৃষ্টি দিলে বোঝা যায় এখানে রাষ্ট্রের ধর্মাকাঙক্ষা এবং দলীয় ভণ্ডামি একই স্বার্থের সমান্তরালে এসে মিশেছে।  ধর্মানুভূতির কথা বলে একবার ফেসবুকের মত গণযোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করা এবং আর একবার গ্রেফতার করা জামায়াত রাজনীতির শীর্ষ নেতৃত্বকে- উভয় এবং দমন নিপীড়ন ও নো টলারেন্স নীতির গন্তব্য এক।  একদিকে ধর্মানুভূতির ভণ্ডামি এবং অপরদিকে রাষ্ট্রের ধর্মাকাঙক্ষা।

 

৩.

দুঃখজনক হলেও, আওয়ামি নেতা, পাতি নেতা ও মন্ত্রীদের প্রচুর হম্বিতম্বিতে তপ্ত যুদ্ধাপরাধ প্রশ্নটি কেন জামায়াত নেতাদের গ্রেফতারে এমনকি ব্যবহার করারও সাহস পেল না সরকার, এর কারণটা খুব দুর্বোধ্য হবে না আপনার কাছে।  যুদ্ধাপরাধ রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে আমরা বহু আগেই সন্দেহ ও প্রশ্ন করেছি, এইবার সন্দেহ হল এই রাজনীতির গন্তব্য ধর্মানুভূতির বহুচর্চিত ব্যবসা দিয়েই সমাধা হবে বোধ হয়।  কারণ, এ পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধ রাজনীতির প্রধান অনুষঙ্গকে আমি যদ্দুর বুঝেছি জামায়াত বা ইসলামি রাজনীতির মোকাবেলার প্রশ্ন হিশেবে সংশ্লিষ্টরা দেখছে, আদতে যুদ্ধাপরাধের বিচার নয়।  জামায়াত বা ইসলামি রাজনীতিকে মোকাবেলার প্রশ্ন ও অস্ত্র হিশেবেই যে ইস্যুর জন্ম, তার পরিণতি যুদ্ধাপরাধ প্রশ্নে না হলেও অন্য যে কোন ইস্যুতে হলেও চলে- এটাই সমভবত বর্তমান পরিণতি।  এখানে ভাষার বিবিধ ভণ্ডামি ও রূপান্তর ঘটবে ও ফতোয়া চলবে।  যথা যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ইত্যাদি।  কিন্তু গন্তব্য ও পাত্র একই।

 

৪.

অতীতে, বিভিন্ন লেখালেখিতে, এবং আজও জামায়াত রাজনীতির বিচার প্রশ্ন ও অনুরূপ অন্যান্য বিষয়ে একটা প্রাসঙ্গিক ও জরুরি তর্কের কথা বলেছি আমরা।  সেটি হল একটা রাজনীতির মোকাবেলা কি আমরা রাজনীতি দিয়ে করবো, নাকি কোর্ট কাছারির হাইকোর্ট ও দমন-নিপীড়ন দিয়ে সারবো।  এই বিতর্কটি খুবই জরুরি প্রপঞ্চ হিশেবে হাজির হয়েছে সবসময় আমাদের কাছে, রাজনীতিবিদ-বুদ্ধিজীবী-আইন ব্যবসায়ী সবার মূর্খতা এবং অথবা সুবিধাবাদিতা ও ফ্যাসিবাদী মনোবিকারের কারণে।  এই মনোবিকার, আওয়ামী হিস্ট্রিয়ার কল্যাণে, কিছুদিন আগে এমনকি ‘মাননীয়’ হাইকোর্ট পর্যন্ত স্পর্শ করেছে, আমরা দেখেছি।  আমরা ইতোপূর্বে এও দেখেছি, আওয়ামী বুদ্ধিজীবীগণ ইসলামি রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে ইচ্ছুক, তাও হাইকোর্টের কাঁধে বন্দুক রেখে; নিজেরা সাহসিকতার সাথে তার দায় নিতে রাজনৈতিকভাবে তৈরি নয়।

 

৫.

ইসলাম- দুনিয়ার ইতিহাসে যার রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানবিক অবদান ঋণার্হ, জামায়াত তেমনতরো একটি বিষয়ের কথা বলে রাজনীতি করে।  এই জন্য, এবং বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এই দলটির তৎপরতাহেতু, জামায়াত কেমনতরো একটি রাজনৈতিক দল, তার রাজনৈতিক অভিলাষ এবং এর ভালমন্দর খুঁটিনাটি এখন আবশ্যকভাবে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যারা জামায়াত রাজনীতির পক্ষে অবস্হান নিতে চান এবং বিপক্ষে লড়াই করতে চান উভয়ের জন্য।

একটা কিম্ভূত বিষয় জামায়াত বলত, সেটি হলো রাষ্ট্রে আল্লাহর আইন, মানে, জাতিরাষ্ট্রের কাঠামোতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলন তাদের উদ্দেশ্য।

আমরা নিশ্চয়ই জানি, দুনিয়াতে ভৌগোলিক উপনিবেশসমূহের পতনের সাথে এশিয়া-আফ্রিকার দেশগুলোতে জাতীয়তাবাদী ভাবধারা ও জাতিরাষ্ট্রের পত্তন ঘটে।  জাতিরাষ্ট্রের ধারণা, কাজেই জাতিরাষ্ট্র নামক ঘটনাটি পশ্চিম ইউরোপীয় ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার রং, রূপ ও রস আহরণ করে পুষ্ট হয়ে উঠেছিল।  সাম্প্রতিককালের পণ্ডিতগণ বলেন, তা কোন ক্রমেই ইউরোপের মধ্যযুগীয় খ্রিস্টীয় অভিজ্ঞতা থেকে পৃথক নয়।  তাদের মতে, এই সম্পর্ক Rapture and Continuity’র।  কিন্তু মডার্ন পাওয়ার তার উৎস, সঞ্চালন ও সম্পর্ক নিয়ে আধুনিক রাষ্ট্রের পরিসরে যে বিশিষ্টতায় হাজির, তা আধুনিক রাষ্ট্রবাদী ইসলামিস্টরা পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝে উঠতে সক্ষম হননি, পুঁজির পদ্ধতিগত সমালোচনা দূরে থাক।  ফলতঃ এই বিন্যাসের মধ্যেই এই ইসলামি রাষ্ট্রবাদীদের অনুকরণ ও প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ দেখা যায়।  তাই লক্ষণীয় হলো, মিশরের ইখওয়ানুল মুসলেমিন, পাক-ভারত উপমহাদেশের জামায়াত এবং এই ঘরাণার দলগুলো ইসলামের কথা বলে পশ্চিমের ধারণাগত প্রকল্পকেই অনুসরণ করে এগিয়ে চলেছে সব সময়।

দেখা যায় এই রাষ্ট্রবাদীদের ইসলামি বিপ্লবচিন্তা ও নেতৃত্ব ক্ষমতার পরিবর্তন এবং পশ্চিমের কাউন্টার বিন্যাস নির্মাণের ‘জেহাদে’ সীমিত।  স্বভাবতই এতে কোন মৌলিকত্ব থাকেনা বরং পশ্চিমের স্ট্রাকচারকেই চূড়ান্ত ও পূজ্য বলে ধরে নেওয়া হয়।  এ ধরণের আন্দোলনকারীদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বাহন ইংরেজি সাহিত্যকে সাহিত্যে সভ্যতাভিত্তিক সমালোচনা ব্যতিরেকেই খুবই গুরুত্বসহকারে পাঠ করানো হয়।  পশ্চিমের সাম্রাজ্যলিপ্সার অস্ত্র ইংরেজি ভাষা এবং সাহিত্যের জমকালো পাঠদানে হারিয়ে যায় সভ্যতা বিষয়ক পাঠ, সভ্যতার সমালোচনা।

এতো গেল আল্লাহর আইন ও ইসলামি রাষ্ট্রকথন।  কিন্তু এইসব আলোচনাও ফালতু হয়ে যাবে যখন গত এক-এগারর সরকার কর্তৃক গঠিত নির্বাচন কমিশনের আপত্তির মুখে তারা এই উদ্দেশ্যর কথা এখন আর উচ্চারণ করবে না বলে জানায় এবং এ কথাটি সংবিধান থেকে মুছে দেবে বলে অঙ্গীকার করে।  এ প্রসঙ্গে জামায়াত নেতৃত্ব হিকমত বলে একটি জিনিশের কথা কর্মীদের বুঝায়- যেখানে কম্প্রোমাইজই মুখ্য।  এই হিকমত এবং কূটনীতিরে তারা এতই শক্তিশালী মনে করে যে, রাজনীতি যে জনগণের সম্মতি উৎপাদনের জায়গা এবং ক্ষমতার মূল বৈধতা- সেটি ভুলে যায়।  তাদের রাজনৈতিক পরিকল্পনার প্রথমেই দেখা যায় অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়া, যার ফলে সহজেই একটি রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি থাকা যাবে এবং একদিন ক্ষমতাকেন্দ্রেও পৌঁছা যাবে।  কিন্তু দেখা যায় জামাতের লোকেদের এই অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য পরিকল্পনায়ও কথিত ইসলামি আদর্শের বাস্তবায়ন বা নৈতিকতা নেই।  তাদের ল্যাণ্ড ডেভেলপমেন্ট ব্যাবসায় সুষ্ঠু নগর পরিকল্পনা দূরে থাক এমনকি কোন পরিকল্পনার ছোঁয়াও পাওয়া যাবে না, স্রেফ টাকা বানানো ছাড়া।  এমনকি কুখ্যাত ইহুদি মহাজনদের সুদি অর্থনৈতিক কারবারের আদলে তৈরি ব্যাংকিং সিস্টেমের ইসলামিকরণও সেইরূপ চরিত্র বহন করে।  তথাকথিত সুদবিহীন, কিন্তু রিস্ক ফ্রি লাভ, যেখানে গরিবের প্রবেশাধিকার নেই।  মানে ধর্ম আছে, লাভও আছে, কিন্তু মানুষ বা মানবিক মানুষ হনুজ দূর অস্ত।

No Comments Yet.

What do you think?

Your email address will not be published. Required fields are marked *