সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও রাজনীতি

আসুন আমরা কিছু উপরি আলাপের ভরসা নিই, নিয়তে ধর্ম।  কেননা জগতের যে কোন সমস্যা মূলত দার্শনিক ও ধর্মীয়।  সেই দিক থেকে ধর্ম অনেক গভীরতর জিজ্ঞাসা ও আলাপ জাগরিত করে।  জাগতিক দুনিয়াদারিতে আমরা উপরিভাগের যে আলোচনা নিয়ে মত্ত থাকি, ধর্ম তারও গোপন কায়কারবার নির্ধারণ করে।  কারণ ধর্মই নৈতিকতা, নন্দন ও রাজনীতির স্বাভাবিক গতিপথের নির্ধারক।  আলাপের প্রথমে কিছু প্রশ্নর ফয়সালা করতে হয়।  যেমন মানুষ হিশেবে প্রথমত নিজের অস্তিত্ব এবং অপর, তার বরাতে সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও রাজনীতি যার মধ্যে প্রতিদিন আমরা জারিত হই, লেখালেখি, বুদ্ধিজীবীতা ও নন্দন চর্চা করি, এইসবের একটা বিচার বিবেচনা খাড়া করা।  মূলত বন্ধুত্ব করলেও, বুদ্ধিজীবীরা আমাদেরকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, আমরা ‘রাজনীতি’ করি।  অগত্যা আমরাও এটাকে বোঝানোর জন্য ‘রাজনীতি’, ‘রাজনৈতিকতা’ এই শব্দগুলোই ব্যবহার করবো।  আদতে ধর্মই গন্তব্য।

১.

‘রাজনীতি’ সম্পর্কিত বাহাসগুলোকে এক জায়গায় এনে আলোচনার বিষয় বানানো এ নোটের উদ্দেশ্য নয়।  এটি কাহাকে বলে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলে দেয়ার চেয়ে যে ভাব বহন করে, যে সুনির্দিষ্ট কাজের জায়গা সেই ভাবের গন্তব্য, তার আলোচনায় আমরা গভীরভাবে আগ্রহী।  ছাঁচাছোলা কথা যেটি, রাজনীতি হলো সম্পর্কের জ্ঞান।  এবং মুআমিলাতেই রাজনীতির প্রকাশ ঘটে।  বন্ধুত্ব, রাজনৈতিকতা এইসব ধারণা মূলত সম্পর্কের মুআমিলাত থেকে উদ্ভূত।  মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক।  এর প্রাথমিক অবস্হা হল মানুষ যখন নিজের অস্তিত্ব, জীবসত্তা ও অপর সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে, তার কাছে নিজেকে ব্যক্ত করতে প্রস্তুত হয়, তখন।  এ পর্যায়ে সে ব্যক্তি, ইনডিভিজুয়াল বা পারসন।  অন্য অনেকের মধ্যে আলাদা একজন।  এই স্তরটি হল মূলত ইন্দ্রিয়সর্বস্ব ও আত্মমগ্ন জীবসত্তা, সেলফ।  ইসলামের গ্রন্হ কোরআন শরীফ নফসের এমন স্তরের কথা জানাচ্ছে আমাদের: যার নাম নফস-ই আম্মারা, যে স্তরে নফস-ই আদেশদাতা, নিয়ন্ত্রক।  এই পর্যায়ে তার নৈতিকতা, নন্দন ও রাজনৈতিকতা দাঁড়ায় না, কারণ এই জীবসত্তায় ‘বিবেক’ থাকে না।  মানে কোন ধর্মভাব থাকে না।  যখন ব্যক্তি নিজের এই জীবসত্তা এবং তার সামনে হাজির ‘অপর’- উভয়ের সম্পর্ককে বিচার-ও-বিবেকবুদ্ধি দিয়ে ঝালাই করতে সচেতন হয়, অপরের মধ্যে নিজেকে দেখতে ও একাত্ম হতে শেখে, তখন ব্যক্তির রাজনৈতিকতার শুরু।  একই সাথে ধর্মভাবেরও শুরু।  এটি আত্মমগ্ন জীবসত্তার সেলফ ও আত্মতা থেকে উত্তরণ-মুহূর্ত।  কোরআন শরীফ নফসের এমন স্তরকে বলছে নাফস-ই লাওয়ামাহ, বিবেকের জাগরণ-মুহূর্ত।  এই বিবেক হলো ফিতরত, মানুষের প্রকৃত স্বভাব, যা একই সাথে সার্বভৌম ও দায়বদ্ধ।  মূলত এই দায়বদ্ধতা ছাড়া মানুষের কোন ধরণের সার্বভৌমত্ব হয় না।  কোরআন শরীফে এই সার্বভৈৗমর নাম দেয়া হয়েছে খেলাফত, মানে সেই যোগ্যতা ও ক্ষমতা, যা দিয়ে ‘স্বাধীনভাবে’ ভাল-মন্দের ফারাক বিচার করতে সক্ষম মানুষ।  মূলত বিবেকের এই জাগরণমুহূর্ত ও দায়বদ্ধতা হল ইন্দ্রিয়সর্বস্ব ও আত্মমগ্ন জীবসত্তা থেকে মানুষের প্রস্হানমুহূর্ত।  এই মুহূর্তে এসে আত্মর দাসত্ব থেকে মুক্তি ঘটে মানুষের।  ফলত বিবেক দিয়ে বিচার করতে স্বাধীন ও সার্বভৌম হয় মানুষ।  এই বিশেষ সার্বভৌম সম্পর্কে সচেতন হয়ে সম্পর্কে সক্রিয় থাকাটাই মুআমিলাত।  এই অবস্হায় ধর্মভাবসম্পন্ন ব্যক্তি হয়ে ওঠে ‘রাজনৈতিক’ ব্যক্তি।  তখন তার নৈতিকতা, নন্দন ও রাজনৈতিকতার যে ধরণটি দাঁড়ায়, তাই হলো বন্ধুত্ব।  মূলত বন্ধুত্বের এই ধর্মভাবটির উপরেই দাঁড়ায় শিল্প ও নন্দন।  যে শিল্পে বন্ধের, সেলফের, আত্মতার অবমুক্তি ঘটে।  মানে বন্ধুত্ব ঘটে।

‘বন্ধুত্ব’ একটি জরুরি ভাব।  অন্তত ধর্মভাবসম্পন্ন মানুষের জন্য।  ইন্দ্রিয়সর্বস্ব জীবসত্তার বিরুদ্ধে জেহাদ ও যূথবদ্ধতার মাধ্যমে, আত্মতাকে বিসর্জন দিতে দিতে বন্ধুত্বের উদ্বোধন ঘটে।  এই বিসর্জনের নাম কোরবানী, মানে ‘আত্ম’ত্যাগ।  বন্ধুত্বে ও যূথবদ্ধতায় সহমর্মিতা, কো-সাফারিংস।  এইভাবে আত্মতার বিসর্জন, সহমর্মিতা, সার্বভৌমের বিনিময় ও বিস্তার দিয়ে বন্ধুত্ব শুরু হয়।  আবার, এই বন্ধুত্বেই সার্বভৌম পরিপূর্ণতা পায়।  কারণ এই অবস্হায় রাজনৈতিক ব্যক্তি সার্বভৌম ও আত্মতাকে সমগ্রে ও বন্ধুতায় সমর্পণ করে।  এইভাবে রাজনৈতিক ব্যক্তির তৎপরতা চলে বন্ধুত্বে ও যূথবদ্ধতায়, নিয়ত এই ভাবের বোঝাপড়া, চর্চা ও পরিচর্যায়।  এই যূথবদ্ধতায় একত্রিত হওয়ার নাম সংগঠন, যা রাজনৈতিক ব্যক্তির বন্ধুত্ব চর্চার পীঠ।  বস্তুত, এই আত্মতার বিসর্জন সে দিতে শুরু করে প্রথমত পরিবারে, পারিবারিক সম্পর্কে।  তারপরে অন্যান্য বন্ধুত্বে, যেমন সমাজ।  সংগঠনের শুরুর পরিসর যদি পরিবার ধরি, আর ব্যপ্ত পরিসর যদি সমাজ বা উম্মাহ ধরি, উভয় মহীরুহেই উপরে আলোচিত এই ধর্মভাবটি সক্রিয়।

২.

উপরে আমরা যে ধর্মভাবের কথা বলেছি, এই ধর্মভাবের প্রশ্নটি স্রেফ ব্যক্তিমানুষ বা পরিবার ও সমাজের প্রশ্ন না।  যে কেউ ‘ব্যক্তি’ হয়ে উঠলে, এবং সেটি যদি পরিবার বা সমাজও হয়, অথবা কোন ‘ইনডিভিজুয়াল’, সেখানে ইন্দ্রিয়সর্বস্ব আত্মতা অর্থাৎ অটোক্রেটিক সেলফ কতখানি সার্বভৌমের নিয়ন্ত্রক ভূমিকা পালন করছে সেটাই এই ধর্মভাবের বিচার।  লক্ষ্যণীয়, এই ধর্মভাব ঐতিহাসিকভাবে পরিবারে এবং সমাজে বিরাজ করলেও, রাষ্ট্রে তেমনভাবে বিরাজ করে না।  কারণ আধুনিক রাষ্ট্র (State) এবং নৈরাজ্যবাদ (Anarchism) দুটোই আমাদের কাছে সার্বভৌমর একটা পাতানো ভাব দাঁড় করায়।  নৈরাজ্যবাদ আত্মতার চরম উদযাপন, যা আমরা উপরে আলোচিত ব্যক্তিত্ব বিকাশের প্রথম জৈবিক স্তরে পাই এবং রাষ্ট্র হল এই আত্মতার অন্য চেহারা, বলা যায় সাংগঠনিক মুখোশ।  যদিও দুটোই পরস্পরের প্রতিক্রিয়া হিশেবেই হাজির থাকে সবসময়, ইতিহাসে।  যেমন, বিদ্যমান রাষ্ট্র ও ব্যবস্হাকে না মানার কারণে নতুন কোন রাষ্ট্রের জন্ম দ্রষ্টব্য।  আবার, রাষ্ট্র ইত্যকার ‘প্রতিষ্ঠানে’র কর্তৃত্বের অধীন থেকে বেরিয়ে আত্মর অমিমাংস প্রতিষ্ঠা-কল্পনা করে নৈরাজ্যবাদ।  উভয়ই অটোক্রেটিক নফস।  আত্মমগ্ন।  আত্মর দাস।  দাস, সার্বভৌম নয়।  তাই রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে দেখা যায়, অবন্ধুত্বপূর্ণ, নিপীড়ক হয় রাষ্ট্র।  একই কারণে, এই রাষ্ট্র ধর্ম হয়ে ওঠার কাঙক্ষাও ধারণ করে ইতিহাসে।  ধর্মভাব নয়, খোদ ধর্ম হয়ে ওঠা।  খোদ ধর্ম হয়ে ওঠার মানে হল তখন রাষ্ট্র নিজের আদেশকেই বিবেক বা প্রকৃত সার্বভৌমের বিপরীতে চূড়ান্ত সার্বভৌম ঘোষণা করে।  ধর্মভাব ব্যক্তির রাজনৈতিকতার জন্য জরুরি অনুসঙ্গ, আবার একই সাথে কোন ‘ব্যক্তি’ বা সংগঠন ধর্ম হয়ে ওঠার চেষ্টা করলে তাকে প্রতিরোধ করাও ধর্মভাবসম্পন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির কাজ।  কেননা আত্মতা কর্তৃক সার্বভৌমর জায়গা দখল, মানে ব্যক্তির সার্বভৌম বা খেলাফতকে পায়ে দলিয়ে তাকে ইন্দ্রিয়সর্বস্ব আত্মতার দাস বানিয়ে তোলার চেষ্টা ঘটেছে।  এটা শিরক।  দাস শুধু আল্লাহরই হওয়া যায়, রাজনৈতিক মানুষের কাজ হলো ব্যক্তির দাসত্বকে বিনাশ করে আল্লাহর দাসত্ব, মানে বিবেকের বন্ধুত্ব ও বিনয় প্রতিষ্ঠা।  যেমন মিশরের ফারাওরা ইতিহাসে এমন ধর্ম হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছিল, হজরত মুসা আ. এর নেতৃত্বে ধর্মভাবসম্পন্ন রাজনৈতিক মানুষেরা তার প্রতিরোধে এগিয়ে এসেছিলেন।  কোরেশ বংশের ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ স. এর লড়াইও ছিল এটাই।  জগতের যে সমস্ত জায়গায় ‘ব্যক্তি’ ধর্ম হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছে, সেই ধর্মাভিলাষী আত্ম’র বিরুদ্ধে লড়াই।  কারণ ‘এটি হল সেই আত্ম, যার প্রদর্শনীতে কোরআন ও গোলাপ থাকে’: যেমন রাষ্ট্রধর্ম, মানবাধিকার, ‘আর আস্তিনের নীচে হন্তারক ছুরি’: যেমন জন-নিপীড়ন, অবিচার, অন্যায় ইত্যাদি।

একই সাথে আবার মনে করিয়ে দেয়া দরকার, আমরা রাষ্ট্রে আছি।  এই জমানায় আমাদের পরিবার, সমাজে থাকাটাও রাষ্ট্রর সাথে সম্পর্কিত, রাষ্ট্র দ্বারা প্রভাবিত, নিয়ন্ত্রিত।  বিবেকের সার্বভৌমর বিপরীতে এটাই সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রীয় আত্মর সাম্রাজ্য, যার মূলে আছে নিয়ন্ত্রক ভূমিকা, সীমাহীন আত্মতা, অহঙ্কার।  তাই, এই জায়গাটি প্রথমেই অবন্ধুত্বপূর্ণ।  ধর্মভাবসম্পন্ন রাজনৈতিক মানুষেরা, যারা বন্ধুত্ব ও সার্বভৌমত্ব চর্চার জন্য তৎপরতা চালাবে, এইটাতো তেমন বন্ধুত্বের জায়গা নয়।  তাহলে এই রাষ্ট্র নামের জায়গাটিতে আমরা কী করবো? এই প্রশ্নের ভেতরেই আমরা একটা উত্তর পেয়ে যাই, সেটা হলো, যদি বন্ধুত্ব ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠাই ধর্মভাবসম্পন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির লড়াই হয়, এই অবস্হায়ও এখানে ধর্মভাবসম্পন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির লড়াই হবে রাষ্ট্রকে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সার্বভৌম করে তোলার লড়াই।  এই লড়াইয়ের অভিমুখ রাষ্ট্রকে রাষ্ট্র হিশেবে টিকিয়ে রাখার চেয়েও, তাকে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সার্বভৌম করে তোলার তাগিদে প্রয়োজনে বিলয় ঘটানো।  রাজনৈতিক ব্যক্তির সংগঠন বা রাষ্ট্রে উত্তরণের ভাব ও ফলাফল হলো এটাই।  মূলত এই ভাব ও তৎপরতাই হল রাজনীতি।  সম্পর্ক ও বন্ধুত্বের জ্ঞান।  এই জ্ঞান-উদ্ভূত লড়াই।

৩.

তাহলে আমরা রাষ্ট্রতত্ত্বে উপনীত হলাম।  উপরে আমরা রাজনৈতিক ব্যক্তির সংগঠন বা রাষ্ট্রে উত্তরণের ভাব বোঝার চেষ্টা করেছি, সংগঠন ও রাষ্ট্রের গলিঘুপচিতে হাঁটাচলা করার সুবিধার্তে।  আসুন এইবার গলি-ঘুপচিতে চলাফেরা শুরু করি।  ব্যক্তির আত্ম থেকে সার্বভৌমে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় যে বোঝাপড়া চলে, উভয়ের কোন অবস্হাকেই হাত দিয়ে ধরে, অনুভব করে বুঝে নেয়া যায় না।  আত্ম ও সার্বভৌম উভয়ই অধর, ব্যক্তির মুআমেলাতে তার প্রকাশ ঘটে মাত্র।  এই উভয় অধরের মুখোমুখি হওয়া, একে প্রশ্ন ও এর জিকির করতে করতে ধর্মভাবসম্পন্ন ব্যক্তি রাজনৈতিক হয়ে ওঠে, এই বিষয়টি আমরা আগেই জেনেছি।  আধুনিক রাষ্ট্র বলে যে ব্যাপারটি আমাদের সামনে হাজির, সেই রাষ্ট্রেরও একটি অধর বৈশিষ্ট্য আছে।  সেটি হল আত্মতা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান যেখানে সার্বভৌমর একটা পাতানো ভাব দাঁড় করায়, আমরা আগেই জেনেছি।  মানে ছদ্মসার্বভৌম।  ছদ্ম বলেই, মূলত রাষ্ট্রের সার্বভৌম গঠনমূলেই ব্যক্তির সার্বভৌমের মতো বিবেকের সার্বভৌম বা বন্ধুত্বপূর্ণ নয়।  ব্যক্তির যে সার্বভৌমর কথা আমরা উপরে বলেছি: খেলাফত, রাষ্ট্রের সার্বভৌম তাকে হরণ করে নেয়ার সুযোগ খোঁজে সবসময়।  ব্যক্তির মধ্যেও এমন একটি ঘটনা আছে, সেটি হল, আত্মপরায়ন জীবসত্তা, মানে সেলফ সার্বভৌমকে অধিকার নিতে জাগরুক থাকে সবসময়, যার বিরুদ্ধে ধর্মভাবসম্পন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে নিয়ত লড়াই করতে হয়।  কিন্তু ব্যক্তির সাথে রাষ্ট্রের পার্থক্য হলো, গঠনদশাতেই রাষ্ট্র সার্বভৌমের উপর সওয়ার হয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণ করার আস্পর্ধা ঘোষণা করে, তবেই রাষ্ট্রের শুরু।  তাই, যে কোন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ঘোষণার মানে হলো, এর বাইরে অন্যান্য সার্বভৌম অস্তিত্ব থেকে নিজেদের আলাদা, পৃথক ও প্রতিরক্ষায় সক্ষম হিশেবে চিহ্নিতকরণ।  নিজের সার্বভৌমত্বের সীমানায় অন্যান্য সব সার্বভৌমত্বের অস্বীকার, প্রয়োজনে প্রতিরোধের ঘোষণা ও মহড়া।  রাষ্ট্রের তাই আলাদা মিলিটারি ফোর্স থাকে।  সীমান্ত-প্রহরী থাকে।  গোয়েন্দা সংস্হা থাকে।  মূলত রাষ্ট্রকে রাষ্ট্র হিশেবে টিকে থাকতে হলে এই অধর সার্বভৌমত্বের সীমানা ও চৌহদ্দি, এর অবিভাজ্য প্রপঞ্চসমূহ ও টুকিটাকি বারবার জিকির করতে ও পাহারা দিতে হয়।  সীমান্তপ্রহরী, সেনাবাহিনী যেমন বারবার মহড়া দেয়, তেমনি।  নোট দিয়ে রাখি, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের সীমানায় ব্যক্তিও বসবাস করে।  তাই, মনে করিয়ে দেয়া দরকার, উপরোল্লিখিত ‘অন্যান্য সব সার্বভৌমত্বে’র মধ্যে ব্যক্তি-সার্বভৌমত্বও থাকে কিন্তু, যাকে অস্বীকার এবং প্রতিরোধ করে রাষ্ট্র।  এইটা রাষ্ট্রের বন্ধুত্বের ফাঁকি।  এই ফাঁকির সুযোগ নিয়েই রাষ্ট্র জরুরি অবস্হা ঘোষণা করে (State of exception), যা নাগরিকের সব অধিকারকে নিয়ন্ত্রণ, সীমিতকরণ ও মূলতবির ক্ষমতা।  এই অবস্হায়, আমরা আগেই বলেছি, রাজনৈতিক মানুষের কাজ হলো রাষ্ট্রকে অধিকতর সার্বভৌম ও বন্ধুত্বপূর্ণ করার লড়াই।  এবং এই লড়াইয়ের অভিমুখ রাষ্ট্রকে রাষ্ট্র হিশেবে টিকিয়ে রাখার চেয়েও, তাকে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সার্বভৌম করে তোলার তাগিদে প্রয়োজনে এর বিলয় ঘটনো।  এখানেই দ্বন্দ্ব।  স্বয়ং রাষ্ট্রের জন্য রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখাটাও সার্বভৌমত্বের একটা জরুরি অনুসঙ্গ, আমরা আগেই জেনেছি।  তাই, রাষ্ট্রের বিলয় এত সহজ প্রশ্ন নয়, না রাষ্ট্র না ব্যক্তি, কারো জন্য।  রাষ্ট্রের জন্য এটি ব্যক্তি এবং অন্যান্য ঘোষিত সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রেক্ষিতে টিকে থাকার প্রশ্ন, আবার ব্যক্তির জন্যও রাষ্ট্র এবং অন্যান্য ঘোষিত সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিপরীতে নিজের সার্বভৌমত্বের লড়াই।  জগতের সব রাষ্ট্রের বিলয় না হওয়া পর্যন্ত স্রেফ একটি রাষ্ট্রের বিলয় মানে অন্য কোন রাষ্ট্রে মিশে যাওয়া, অথবা নতুন রাষ্ট্রের জন্ম।  এইভাবে রাষ্ট্রের বিলয় হয় না।  ব্যক্তির সার্বভৌমেরও প্রতিষ্ঠা হয় না।

৪.

রাষ্ট্রে বন্ধুত্ব ঝুঁকিপূর্ণ।  কিন্তু আবার বন্ধুত্বই রাষ্ট্রে উত্তরণের ভাব, এই ব্যাপারটা আমাদের বোঝা দরকার।  এই বন্ধুত্ব হল বিদ্যমান রাষ্ট্র বা ব্যবস্হার বিপরীতে সমস্বার্থের যূথবদ্ধতায় যে বন্ধুত্ব তৈরি হয়।  বিদ্যমান ব্যবস্হা বা রাষ্ট্র মানে হলো যে নতুন রাষ্ট্র তার প্রেক্ষিতে অন্য রাষ্ট্র।  রাষ্ট্রের ভেতরে এবং বাহিরে এই দ্বৈততার সম্পর্ক নির্ণয় ও সঠিক পাঠ রাজনৈতিক মানুষের কর্তব্য নির্ধারণ করতে পারে।  যেমন বাংলাদেশ, উনিশ শ একাত্তর সালে পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠীর অবিচারের বিরুদ্ধে যে বন্ধুত্বের জন্ম।  সব ধরণের কন্সপিরেসি থিওরি বাদ দিয়ে, মোটামুটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বাইরে অন্যান্য যেসব রাষ্ট্র আছে তার সাথে বন্ধুত্ব নেই বলেই তারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রে হাজির নেই।  অন্যতর রাষ্ট্রে তৎপর।  যেমন ভারত।  পাকিস্তান।  পাকিস্তান থেকে আলাদা, আবার ভারতে বিলীন হতে ইচ্ছুক নয় বলেই বাংলাদেশ আলাদা রাষ্ট্র।  এটাই তো।  তাহলে ভারত, পাকিস্তান এরা আমাদের শত্রু? বটেই তো।  যদিও ডিপ্লোমেটিক ভাষায় আমরা এমন শব্দ উচ্চারণ করি না, বলি বন্ধুরাষ্ট্র বা প্রতিবেশী রাষ্ট্র।  মূলত যতই বন্ধু ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র হোক না কেন, রাষ্ট্রের বাইরে অন্য সব রাষ্ট্র সম্ভাব্য শত্রু অথবা নেহাত শত্রু।  তাই বাংলাদেশের সীমান্ত-প্রহরী বিজিবি জওয়ানরা বাংলাদেশ-ভারত-সীমান্তে যে কোন সম্ভাব্য আক্রমণের আশঙ্কায় দিনরাত টহল দিচ্ছে।  প্রতিরোধ করবে বলে।  অনুরূপভাবে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীও, আমাদের লাগোয়া সীমান্তে।  বন্ধুরাষ্ট্র বলে বসে নেই।  এই বন্ধুত্ব ডিপ্লোমেটিক, সুযোগ পেলেই অপর বন্ধুত্বের ভূমি দখল করতে পিছপা হয় না।  অপর নাগরিকদের খুন করে, কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখে।  ফেলানির কথা মনে আছে তো? ডিপ্লোমেটিক বন্ধুত্বে এইসবের ফয়সালা ছাড়া এগুনো যায় না।  আবার, মনে রাখতে হবে, ইজরায়েলের সাথে আমাদের কোন ডিপ্লোমেটিক সম্পর্কও নেই।  মানে, বহিঃরাষ্ট্রের সাথেও, সম্পর্ক থাকা-না থাকা বা না-রাখার ব্যাপার আছে।  এখানেও সম্পর্ক ও বন্ধুত্বের জ্ঞান।  যদিও এর প্রকৃতি ভিন্ন।

তাহলে ডিপ্লোমেটিক বন্ধুত্বের ফয়সালা, এখানে এসেই, অন্যান্য রাষ্ট্রের বিপরীতে রাষ্ট্র প্রথম রাষ্ট্র হিশেবে অপরের সামনে নিজেকে দাঁড় করায়।  অনেকটা ব্যক্তির মতই।  এই বন্ধুত্বে এসেই উপরে আলোচিত রাষ্ট্রীয় সার্বভৈৗমত্বের পূর্ণ প্রকাশ ঘটে, যদিও ছদ্ম, পূর্ণভাবে স্বয়ম্ভূ ও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে।  যদি রাষ্ট্র তেমনতরো বিকশিত হয়ে উঠতে পারে।  কারণ এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র তার সার্বভৌম জনগণের একটি ‘বানানো’ সম্মতি নিয়ে, তাদের হয়ে অন্য রাষ্ট্রের সাথে ফয়সালা করতে যায়।  এই ফয়সালা করতে ব্যর্থতা ও দুর্বলতার পরিচয় দিলে রাষ্ট্রও ব্যর্থ হয়।  আবার, এই বৈপরীত্যে রাষ্ট্র যখন ব্যক্তি-সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে, জনগণের প্রতিপক্ষ অবস্হানটি সম্পর্কে রাখ-ঢাক না করে, প্রকাশ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে, রাষ্ট্রর ভিতও তখন নড়বড়ে হয়ে ওঠে।  কারণ জনগণের প্রতিপক্ষে রাষ্ট্র পূর্ণ সার্বভৌম ইচ্ছা ধারণ করতে অক্ষম, সর্ব অর্থে, সব দ্বৈততাসহ।  কেননা জনগণ এবং তাদের ইচ্ছা ও সম্মতি উৎপাদন করেই রাষ্ট্র সার্বভৌমত্বের দাবিতে টিকে থাকতে সক্ষম হয়।  এই জন-ইচ্ছে ও সম্মতি যদি পুরোপুরি রাষ্ট্রের বিপরীতে চলে যায়, রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখার ‘ক্ষমতা’ হারায়।  বরং জন-ইচ্ছার কাছে রাষ্ট্রের নতি স্বীকার করাই তখন নিয়তি হয়, জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছের কাছে রাষ্ট্রের সার্বভৌমের আত্মসমর্পণ বা পতন।  রাষ্ট্রের বিলয় বা নতুন রাষ্ট্রের শুরু।

৫.

এবার বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে সুনির্দিষ্টভাবে আলাপে আনা যাক।  উপরে আমরা রাষ্ট্রের সার্বভৌম ঘোষণায় জরুরি অবস্হার উল্লেখ করেছি।  লক্ষণীয়, বাংলাদেশ রাষ্ট্রে এখন এমন একটি ‘জরুরি অবস্হা’ (State of exception) বিরাজ করছে, যা এখন আর স্রেফ জরুরি (exception) নয়, বৈশ্বিক রাজনীতির সাথে তাল দিয়ে ‘সর্বসময়ের বাস্তব অবস্হা’ হয়ে উঠেছে।  পুঁজি এই অবস্হাকে বোঝার জন্য জরুরি অনুসঙ্গ, এইটা নোক্তা, পরে অন্য কোথাও সুযোগমতো আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত আলাপের সুযোগ নেব।  পুঁজির বৈশ্বিক নিরাপত্তার খাতিরে ঘোট পাকানো রাষ্ট্রের এ অবস্হাকে পণ্ডিতগণ সিক্যুরিটি স্টেট (Security State) নাম দিয়েছেন।  যে অবস্হায় ভেতর এবং বাহিরে রাষ্ট্রের একমাত্র কাজ হলো বিশ্ব-পুঁজির নিরাপত্তা প্রদান, এবং এর জন্য সব ধরণের ব্যবস্হা গ্রহণ।  এ অবস্হায় বিশ্ব-পুঁজির বিপনন ও নিরাপত্তা-ব্যবস্হার নাম রাষ্ট্র।  মানে এ অবস্হায় রাষ্ট্র হল পুঁজির দাস।  আমরা উপরে দেখেছি, রাষ্ট্র ব্যক্তির সার্বভৌম খেলাফতকে দাস বানিয়ে রাখার চেষ্টা করে, আবার এই সময়ের জরুরি রাষ্ট্রগুলো পুঁজির দাসত্ব করে।  এও সেই আত্ম, যা সার্বভৌমের উপরে সওয়ার হয় এবং দাস বানায়।  এখন রাষ্ট্র হল এই উভয় শয়তানের ঘোট-পাকানি।  বাংলাদেশে এই অবস্হাকে বোঝার জন্য দ্রষ্টব্য হলো: জন-বিতর্ক ও বিরুদ্ধ মতের উপর স্পর্শকাতরতা, গোপনীয়তা, রাষ্ট্রের ভেতরে জন-ইচ্ছের উপরে ব্যারিকেড নির্মাণ, লাঠিচার্জ, গ্রেফতার-হুলিয়া ও ক্রসফায়ার, সেফ হোম নামের টর্চার সেল, কল্পিত জাতীয় শত্রু ‘স্বাধীনতা-বিরোধী’ নির্ণয় ইত্যাদি।  আবার, এই অবস্হায় শয়তানে শয়তানে যে সমস্ত ঘোট পাকে, তার কয়েকটি: সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ‘আন্তর্জাতিক’ যুদ্ধে মিত্রতা, কনকোফিলিপসের সাথে চুক্তিতে জ্বালানি সম্পদ সমর্পণ, জাতিসংঘের শান্তি-ব্যবসায়ে ভাড়া খাটা সেনা অংশের স্বার্থ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ও নির্ণায়ক হয়ে ওঠা, ট্রানজিট ও এক্ষেত্রে শুল্ক আরোপে সভ্য-অসভ্যের মশকরা, দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় গোয়েন্দাদের হেনস্হা, ভারত-বাংলাদেশ যৌথ রবীন্দ্র সম্মীলন (যে রবীন্দ্র সর্বভারতীয় কনফেডারেশনের প্রতীক হিশেবে নির্মিত, আমরা পূর্বে এ সম্পর্কিত পাঠ নিয়েছি), ‘বাঙালি’ জাতীয়তাবাদ (যে ‘বাঙালি’ জাতীয়তাবাদ ও ‘বাঙালি’ সংস্কৃতির সাথে ‘সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদী ও সম্প্রসারণবাদে’র সখ্যর রাজনৈতিক পাঠ সম্পন্ন করেছি আমরা বহু আগেই, অন্যত্র)- ইত্যাদি।  আবার দ্রষ্টব্য হতে পারে, সংবিধিবদ্ধ কেতাবের সাহায্যে এই অবস্হাকে আইনি পরিসরে মর্তবা প্রদান ও জায়েজ করার জন্য তৎপরতা।  যেখানে জাতি হিশেবে রাষ্ট্রের ভেতরের কিছু জনগোষ্ঠী গুম হয়ে যাবে, যেমন: অবাঙালি পাহাড়ীরা, ‘বাঙালি’ জাতীয়তাবাদ ঘোষণায়।  আবার, একই সাথে ব্যক্তি হিশেবে নাগরিকের হাত শিকল দিয়ে বাঁধা থাকবে, মুখ থাকবে বন্ধ, যাতে তার সার্বভৌম ইচ্ছার প্রকাশ ঘটাতে না পারে।

মূলত ব্যক্তির সার্বভৌমের প্রতি রাষ্ট্রের এই যুদ্ধ ঘোষণা, আবার, জনগণের সার্বভৌমকে রুখে দিতে শয়তানদের ঘোট পাকানোর এই অবস্হাটাই হল রাষ্ট্রের ধর্ম হয়ে ওঠা।  এই অবস্হায় ধর্মভাবসম্পন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির লড়াই আরো সুস্পষ্ট হয়, রাষ্ট্রকে বন্ধুত্বপূর্ণ করে তোলা বা এর বিলয়ের লড়াই।  এই তৎপরতা হল রাজনীতি।  সম্পর্ক ও বন্ধুত্বের জ্ঞান এবং এই জ্ঞান-উদ্ভূত লড়াই।
The nafs has a rosary and a Koran in its right hand, and a scimitar and dagger in the sleeve’: Jalaluddin Rumi at Mathnawi, From Nicholson, Reynold (1990). Warminster: Gibb Memorial Trust.

No Comments Yet.

What do you think?

Your email address will not be published. Required fields are marked *