‘নিরন্তর বোঝাপড়া তৈরির জার্নি বলতে পারেন’

এই আলাপটি হয় ওয়াহিদ সুজনের সাথে। ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৪ তারিখে। অনলাইনে। উপলক্ষ বইমেলা ও ‘সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও রাজনীতি’। দ্য রিপোর্টের পক্ষ থেকে। মূল সাক্ষাৎকারের লিঙ্ক

 

এবারের মেলায় কী কী বই আসছে?

একটাই বই। ‘সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও রাজনীতি’। বইমেলায় নয়, বইমেলাকালীন আসবার সম্ভাবনা তৈরি হইছে। হয়তো দু-একদিনের মধ্যেই।

 

কোন প্রকাশনী বের করছে?

দুয়েন্দে। দুয়েন্দে পাবলিকেশন্স।

 

‘সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও রাজনীতি’ সম্পর্কে কিছু বলুন।

এককথায় বলা মুশকিল। আমার লেখালেখিগুলোর নির্বাচিত সংকলন বলতে পারেন। ভূমিকায় বলেছি, এই বইয়ের লেখাগুলো ইতিহাসের ভেতরে বসে, ইতিহাসের নামতা গুনতে গুনতে, সেই ভ্রমণের অংশ হিসেবেই লিখিত হইছে। ফলত এই সব লেখা ইতিহাসের সাথে লেখকের ডায়লগ ও বোঝাপড়ার অংশ। রাষ্ট্র ও রাজনৈতিকতার দিক থেকে বাংলাদেশ ও এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে যে বিকার ও সঙ্কট উপস্থিত, তার একটা বাছ-বিচার করার চেষ্টা করেছি বইটির ভূমিকা ও অন্যান্য লেখালেখিতে। কর্তব্য, নীতি, দর্শন ও সমাজতত্ত্বের দিক থেকেও আলাপ তোলার চেষ্টা আছে। কোনো পাঁড় একাডেমিক আলাপ নয়। ডায়লগ ও সম্পৃক্ততার জায়গায় নিরন্তর বোঝাপড়া তৈরির জার্নি বলতে পারেন। নাম প্রবন্ধটি এ ক্ষেত্রে সূত্র হিসেবে ভাবা যেতে পারে- সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও রাজনীতি।

 

ঢাকার বাইরে থেকে অমর একুশে গ্রন্থমেলার সঙ্গে নিজের সংযোগ ঘটান কীভাবে?

আলাদা ধরনের সংযোগ কেন প্রয়োজন? একটা হতে পারে, বাজারি প্রয়োজন। যেমন এ বছর আমার বই বেরোচ্ছে, পাঠকগণ কীভাবে আমার বই সহজে পেতে পারেন, সে প্রশ্ন। আমি চট্টগ্রামে বসেই ঢাকার সব বইপত্র সহজে পাইতে পারি। এখন অনলাইনেও বইপত্র পাওয়া যায়, এইটাতে আমি খুশি। আমি অনলাইনে যে কোনো দ্রব্য সহজে পাওয়ার যে ব্যবস্থা, তার পক্ষে। চট্টগ্রামে সম্ভবত বইয়ের সবচেয়ে বড় কেনাবেচার জায়গা তৈরি হইছে এখন। বইয়ের জন্য ঢাকার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না আমাদের। তবে একটা সংযোগ আছে। গ্রন্থমেলায় আমার একবার ঢাকায় যাওয়া হয় কাকতালীয়ভাবে। কারণ আমি আড্ডা পছন্দ করি। আড্ডা যদি মহান হয়, আমি সেই মহান কারণে যাই। বন্ধুদের পাই। বইমেলা তার উপলক্ষ তৈরি করে দেয়।

 

চট্টগ্রাম শহরে একটি বড় বইয়ের দোকান হয়েছে। এটা শহরের কথা। কিন্তু এর বাইরে বইকে কীভাবে প্রান্তিক পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া যায় বলে মনে করেন?

বই ব্যবসায়ীগণ ভালো বলতে পারেন। এইটা তাদের টিকে থাকার প্রশ্ন। বইয়ের লেখক হিসেবে আমাদেরও, সম্ভবত; যদি সে অর্থে ধরেন। আবার, আলোকব্যবসায়ীদেরও প্রশ্ন। উভয়েরই ভেবেচিন্তে বের করতে হবে কীভাবে বইকে সর্বখাদ্য বানিয়ে, বইয়ে বিনিয়োগকৃত যে পুঁজি, তার ম্যাক্সিমাম লাভ ঘরে তোলা যায়। পুঁজি ও আলো উভয়েরই এখানে সমান্তরাল ইন্টারেস্ট। যেমন ধরুন, পাহাড়িদের শিক্ষিত করে তোলা, বাংলায় শিক্ষিত। মানে বাঙালি বানানো। যেন বাংলা বইয়ের ভোক্তা বাড়ে। বাংলা ভাষায় বেশি লোক কথা কয়। যেমন ধরুন কয়েকদিন আগে হাইকোর্টে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর আদেশ। বিজ্ঞাপন, নামফলক, প্রেমালাপ, মানে ড্রয়িংরুম থেকে বেডরুম সব জায়গায় বাংলা ভাষার প্রচলন একটা গুরুতর প্রশ্ন কিন্তু। বইমেলাকে মহান করে তুলতে হবে। আরো ভদ্রলোকীয় ভাষায় বললে, উন্নয়ন ভাবনা আর কি। কথা হলো, আপনার ছড়িয়ে দেওয়ার প্রশ্নের মধ্যে আপনি এইসব রেখেছেন তো?

 

বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা। একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। এবারের মেলা থেকে বই কেনার পরিকল্পনা নিয়ে বলুন।

কিছু বইপত্র তো কেনা হয়ই। বইয়ের দোকানে গেলে যেমন, বইমেলায় গেলেও। এখানেও হবে হয়তো।

 

বইমেলার স্থান সম্প্রসারণের বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

কোনো গুরুতর ভাবনা ভাবতে সুবিধা বোধ করছি না। বাংলা একাডেমি সরকারি প্রতিষ্ঠান। তার অধীনে বাংলা বানান ও ছন্দরীতি আসবে। বইমেলা হবে। বাংলা একাডেমি পুরস্কার হবে। এই সব নিয়তিরে যারা অব্যর্থ ভাবতে বইসা গেছেন, তাদের বইমেলা নিয়ে অনেক চিন্তা। আমি সেই চিন্তার ভোক্তা হইতে রাজি না।

 

এই বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় বই বেচা-বিক্রি নিয়েও কথা উঠেছে। এ ব্যাপারে কী বলেন?

হ্যাঁ, এইরকম কথা আসছে। এখন ধরুন, উপরে বাংলা একাডেমির দাদাগিরির প্রশ্ন করেছি। কিন্তু এইটা তো অন্য দাদাগিরির প্রশ্ন। খোদ বাংলা একাডেমি বা বাংলাদেশ রাষ্ট্রেরই ভাবনার বিষয়। মনে রাখতে হবে, প্রশ্নটি আসছে ভারতীয় লেখকের বই নয়, ভারতীয় বই প্রসঙ্গে। আমার মতে, ভারতীয় বই মানে ভারতীয় পুঁজি। ভারতের পুঁজি মানে ভারতের অবিকশিত সামন্ততান্ত্রিক পুঁজি। অবিকশিত, ফলে ভারত তার আশপাশের ছোট রাষ্ট্রগুলোর সাথে কৃপণ ও কুপমণ্ডুক প্রতিবেশী, আমাদের সকল অভিজ্ঞতায়। সেই স্বার্থপর পুঁজির সাথে যে কোনো আদান-প্রদানে আমাদের সতর্কতার সাথে আগানো প্রয়োজন। শুধু বইমেলা নয়, সর্বক্ষেত্রে। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা থেকে আমরা জানতে পারছি, এ দেশের সংস্কৃতিমন্ত্রকের প্রধান সমতার গান গেয়েছেন। তারাই জানিয়েছেন, আগামী বছরই বইমেলায় ভারতীয় বই আসছে।

কিন্তু কথা হলো, স্রেফ সমতা নিয়ে আলাপ শেষ করতে গেলে অনেক সমতার প্রশ্ন আসে। ভারতের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক লেনদেনের জায়গা অনেক, কোথাওই সমতা নেই। ভূমির ভাগ ও পানির নায্য হিস্যার প্রশ্ন। বাণিজ্য। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী শুধু ১০ বছরে প্রায় ৯৫০ জন বাংলাদেশিকে খুন করেছে আমাদের সীমান্তে। এটা মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য। সমতা আনতে হলে আমাদেরও হয়তো খুন না হওয়ার সমতা, নয়তো খুন করার সমতা অর্জন করতে হবে। এই সব না ভাইবা ভারতীয় পুঁজির বইমেলায় কীভাবে স্থান হবে, তার গদগদে আলাপ ক্ষতিকর।

 

লেখালেখির ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী?

আমি পরিকল্পনা নিয়ে লিখি না। অন্তত এখন পর্যন্ত। লেখা হয়ে গেলে নানান পরিকল্পনা হয়।

No Comments Yet.

What do you think?

Your email address will not be published. Required fields are marked *