কবিতা নিয়া

এই আলাপগুলোর শিরোনাম দিলাম: কবিতা নিয়া। কিন্তু আসলেই কি কবিতা নিয়া? বলা মুশকিল। যাদের সাথে আলাপ, তারা কেউ কেউ কবি, স্বনামধন্যও। আবার অকবিও আছেন। কিন্তু বোঝা যায়, তারা কবিতা পছন্দ করেন বা পড়েন বা সমালোচক। যারা কবি, তাদের অনেকেই কবিতারে একটা নির্ভেজাল দুনিয়া নাম দিয়া হাজির করেন, যাতে অন্য যে কোন আলাপ নিষিদ্ধ। তাহাদের এই কবিতার হেরেমে আমি পাঠক, সমালোচক বা কখনো কখনো কবি হিশেবেও উঁকি দেবার গর্হিত চেষ্টা করেছি। এই আলাপগুলো সেই উঁকি-ঝুঁকির বয়ান। এই আলাপ আরো চলবে, হয়তো বহুদিন। কারণ একটা বোঝাপড়ার ভেতর দিয়ে না গেলে তো কবিতা, সাহিত্য, লেখালেখি, জীবন সবই অনর্থ। এই পুনঃহাজিরাতে বিরক্ত যারা, তাদের কাছে মাফ চেয়ে।

এক.

:: প্রথম আলাপের লিঙ্ক দুই হাজার এগার সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়। তানভির চৌধুরীর একটি কবিতায় এ আলাপ হইছিল। বিভিন্নজন আলাপ করছিলেন। মজনু শাহ, কবিতাটির লেখক তানভির চৌধুরী এবং আরো অনেকে। আমার আলাপের সাথে এই দুজনের ইন্টারেকশন হয়। আলাপের মাঝপথে আমার প্রবেশ। আমার মনে হয়, এই আলাপটিও এখানে প্রাসঙ্গিক। ২০১৪ সালে এই আলাপটি ঠিক কীভাবে করতাম, বলা মুশকিল। শুরুটা শব্দ ও শব্দ নির্বাচনের রাজনীতি নিয়ে।  ::

মজনু শাহ: খাঁটি বাংলা শব্দ নিয়ে ভাবতে গেলে দেখা যাবে, লেখাই চালানো দায়। যে-কোনো শব্দই লেখক নিতে পারেন। কী-ভাবে ব্যবহার করছেন, সেটাই ব্যাপার…

তানভির চৌধুরী: শব্দ ও শব্দ নির্বাচনের রাজনীতি আছে জনাব।

মজনু শাহ: ..আমার ক্ষুদ্র যে অভিজ্ঞতা, তাতে দেখেছি, এই শব্দ-রাজনীতি সচেতনতা, অনেক সময় লেখককে গিলে ফেলে। অনেক বড় তর্ক তিনি করতে পারেন, অনেক বাহাস, কিন্তু লেখা পড়লে হতাশ হতে হয় শেষে।

মজনু শাহ: শব্দ-রাজনীতি বিষয়ে আমার মন্তব্যটা, আপনার কথার প্রেক্ষিতে।

রিফাত হাসান: “কী-ভাবে ব্যবহার করছেন”- এটাও রাজনীতিই বটে। “এই শব্দ-রাজনীতি সচেতনতা, অনেক সময় লেখককে গিলে ফেলে।”- হাঁ, লেখককে গিলে ফেলার ক্ষমতা আছে বলেই এই রাজনীতি সম্পর্কে সম্বিৎ-জ্ঞান। কারণ রাজনীতিকে ঠাহর করতে পারাই প্রকৃত লেখকের কাজ। এই ব্যাপারটিকে বাদ দিলে লেখকের আর কোন কাজই নেই। মাফ করবেন, আপনাদের আলাপে অনাহূত ঢুকে পড়লাম।

মজনু শাহ: আপনি যেটা বলছেন, তার সত্যতা নিশ্চয় আছে।

আমি একেবারে কেজো জগতের কথা বলেছি। দেখেছি, কথার মহারাজ হয়ে ওঠেন এই করতে গিয়ে, একেকজন। আমি জানি না কেন এমনটা হয়। অনুমান করি, বুদ্ধি প্রবল হয়ে উঠে, লেখার জন্য যে সৃজন-আবেগ, তা হারিয়ে ফেলেন। তখন কেবল এই শব্দ কেন, ঐ শব্দ কেন, এটা ঔপনিবেশিক, ওটা মধ্যযুগের, এইসবের দিকে নজর যায় বেশিটা, লেখাটা গৌন হয়ে পড়ে।

রিফাত হাসান: যদ্দুর ভেবে উঠতে পেরেছি এ পর্যন্ত, লেখালেখি প্রবলভাবে রাজনৈতিক এবং ইতিহাসসচেতনার বিষয়। স্রেফ কোন অনৈতিহাসিক সম্পর্ক ‘লেখালেখি’তে ঘটে না। ইতিহাস সংস্লিষ্ট থাকে। কারণ ‘লেখালেখি’টা ইতিহাসেই ঘটে, বাস্তবে। মানুষ তার ঐতিহাসিক অপর এর সাথে যোগাযোগ এবং আলাপ ঘটানোর চেষ্টা করে লেখালেখিতে। জীবসত্তার এই যে ইতিহাসে প্রসার ও উত্তরণ ঘটে, আমি এইটারে সম্পর্ক বলি। আমি মনে করি, এই সম্পর্ক-জ্ঞান, সম্পর্ক ও বন্ধুত্বের মুআমেলাত-ই হল রাজনীতি। আর ‘কেজো’ বিষয়ের কথা যদি ধরেন, শব্দের রাজনীতি আছে তা মানি, যেহেতু শব্দ ঐতিহাসিক বিষয়, ইতিহাসেই বেড়ে ওঠে, কিন্তু এই সুনির্দিষ্ট শব্দ সম্পর্কে উপরে তোলা আপত্তির জায়গাটা আমার কাছে পরিস্কার নয়।

রিফাত হাসান: “কথার মহারাজ হয়ে ওঠেন এই করতে গিয়ে, একেকজন। ..অনুমান করি, বুদ্ধি প্রবল হয়ে উঠে, লেখার জন্য যে সৃজন-আবেগ, তা হারিয়ে ফেলেন।”

এদ্দুর খারাপ বলেন নাই। আপনি মোটামোটি জানেন, কেন এমন হয়, কারণ আপনি বলেইছেন যে, ‘বুদ্ধি’ প্রবল হয়। আমাদের এ…খানে বুদ্ধি এবং বুদ্ধিজীবীতার অনুবাদ করা হয় স্রেফ rational mind দিয়ে। কলিম খান তাঁর বঙ্গীয় শব্দার্থকোষে দেখাচ্ছেন, rational mind বুদ্ধত্বের বহিরাঙ্গ মাত্র, পুরোটা নয়। তাই স্রেফ কথার সভ্যতা এটি। কথাতে সব হারিয়ে যায়। আপনি ঠিক বলেছেন। কিন্তু যখন বলেন, ‘কেবল এই শব্দ কেন, ঐ শব্দ কেন, এটা ঔপনিবেশিক, ওটা মধ্যযুগের, এইসবের দিকে নজর যায় বেশিটা, লেখাটা গৌন হয়ে পড়ে।’- আমি বুঝতে পারি না। কারণ এখানে লেখাটিকেই আলোচনায় আনার খাতিরে এইসব রাজনৈতিক পাঠ সারা হচ্ছে। লেখাটি গৌন হবে এই আলোচনাগুলোকে না আনলে, স্রেফ ভাষার নন্দনে মুগ্ধ হয়ে থাকলে। লেখা বলতে নিশ্চয় স্রেফ ঐ ফর্মটি নয়, বরং ওখানে যা বলতে চেয়েছেন তা। তাই নয় কি?

মজনু শাহ: আমি মনে করি, এই সম্পর্ক-জ্ঞান, সম্পর্ক ও বন্ধুত্বের মুআমেলাত-ই হল রাজনীতি।… আপনার এই মন্তব্য অসাধারণ।রাজনীতি বলতে আমরা প্রায়শ যে একটা সংকীর্ণ জিনিস বুঝে থাকি, তার থেকে বেরিয়ে, এই উপলব্ধির উদারতা আমায় খুব স্পর্শ করলো।

রিফাত হাসান: আর একটা নোক্তা, এই আলাপে আপনার মন্তব্য থেকে একটা ইশারা: ‘কবিতা’, অন্যান্য ‘সৃজনশীল সাহিত্য’ এবং নিরেট ‘গদ্য’ যেখানে সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতির আলাপ হয়- তুলে রাখলাম। এইসবের প্রত্যেকটার আলাদা বিচার আপনি কীভাবে করতে চান, আপনার সুযোগ হলে এই আলাপ চলতে পারে। আমার নিজের একটা নোক্তা: সঙ্গে কৃষিকাজরেও আলাপে আনলে জরুরতগুলো পূর্ণ হয়।

মজনু শাহ:  বলছিলাম, লেখাটা গৌণ হয়ে পড়ে। সেটা একটু বিস্তারিত বলি এবার।

আমি এটা কোনো রচিত লেখার কথা বলছি না। বলছি, সেসব বুদ্ধি-প্রবল হয়ে ওঠা লেখকের আপাত পরিণতির কথা,সৃজনশীল ছিলেন যিনি, হয়ে পড়েছেন করুণ বাগ্মী, যা আমি চারপাশে চাক্ষুষ করে থাকি।

দেখেছি,বলতে পারেন, কয়টাই বা আর দেখা আমার,সামান্য অভিজ্ঞতায় দেখেছি, কথার বড় বড় মহাজন তৈরি হয়েছে বঙ্গদেশে, অধিকাংশ, অনর্থক প্যাঁচালে কাল হারিয়ে ফেলছেন। খুব ইচ্ছে করছে কটা নাম বলতে, কিন্তু অযথা হুজ্জৎ হবে, তাই থাক।বলতে চাইছি, নানা তত্ত্ব, নানা সচেতনতা একজন যতই অর্জন করতে থাকেন, লেখার কাজটা হারিয়ে যায় অনেকের, সবার ক্ষেত্রেই যে এমন তা নিশ্চয় নয়, ব্যতিক্রম আছে। এনাদের আছে শুধু কথা, কথা, আর কথা…
আড্ডায় তিনি টেবিল মাতিয়ে দিচ্ছেন, কিন্তু ক্রিয়েটিভিটির বেলায় ঠনঠনাঠন।

রিফাত হাসান: আপনার ভাব মোটামোটি বুঝতে পেরেছি।

সেই বরাতেই, লেখা এবং সৃজনশীল লেখা (আপনার উত্থাপিত ক্রিয়েটিভিটি), কৃষিকাজ এবং অন্যান্য রাজনীতি- এই মুহূর্তে আমরা মিলিয়ে পাঠ করতে পারি। কী বলেন।

মজনু শাহ: নিশ্চয় পারেন। অধিকন্তু, আরও কিছু যদি যোগ করা যায়, পরে পরে তাও রাজনীতিভুক্ত ভাবা যাবে।হামেশা একটা কথা শুনে থাকি, কিছুই না-কি রাজনীতি-অরিতিক্ত বা বহির্ভুত নয়, সেই পার্সপেক্টিভে।যদিও এই কথায় আমার ভরসা কম। আমার ভরসা একদম সরাসরি যাকে বলে “কাজ”, তাতে।

রিফাত হাসান: মানুষের সব ধরণের মুআমেলাতকে আমি রাজনীতিভূক্ত ভাবি, এবং আমার রাজনৈতিকতা দিয়ে বিচার করতে চাই। আমার এই রাজনীতিটা কী, উপরে উল্লেখ করেছি। সেই ক্ষেত্রে এটি সম্ভব। উপরে আপনি সৃষ্টিশীল এবং অন্যন্য লেখালেখির একটা পার্থক্য খাড়া করিয়েছেন। আমি কৃষিকাজ এবং অন্যান্য অসৃষ্টিশীল শিল্পকে এই আলাপের মধ্যে ঢুকিয়ে এই আলাপের চৌহদ্দির প্রসার কত হতে পারে তার আন্দাজ নিলাম মাত্র। কিন্তু আপনি এই পার্থক্য কীভাবে খাড়া করেন, তা জানা হলো না।

মজনু শাহ: কৃষিকাজ এবং অন্যান্য অসৃষ্টিশীল শিল্পকে এই আলাপের মধ্যে ঢুকিয়ে এই আলাপের চৌহদ্দির প্রসার হয়ত বাড়ানো যাবে,সবি আপনার ইচ্ছা-নির্ভর।কেবল আমি তাল হারিয়ে ফেলব কি-না তাই ভাবছি।

রসগোল্লার প্রতিটি কণা যে অর্থে রসগোল্লা, গুয়ের প্রতিটি কণা যে অর্থে গু,…সেমতি,সৃষ্টি বা অসৃষ্টিশীলতার পার্থক্য নির্ণিত হবার কথা।

ভাল থাকুন।আজ এই পর্যুন্ত। দূর বা অদূর ভবিষ্যতে আপনার আরও কথা শোনার উদ্গ্রীব ইচ্ছে রইল।

রিফাত হাসান: মাফ করবেন Maznu Shah। কথা শোনানো আমার অভ্যেসে নেই। আলাপ করবার লোভ আছে বলতে পারেন। এখানে লোভটা এই কারণে হল যে, আপনার মন্তব্যগুলোর মধ্যে আমার আগ্রহের বিষয়টি খুঁজে পেয়েছি। সে ক্ষেত্রে আমার নিজের তাল ঠিক করাটাই উদ্দেশ্য, মাঝখানে আপনি তাল হারালে আমাকে ভুল বুঝবেন। কিন্তু, ‘রসগোল্লা’ এবং ‘গু’: ‘সেমতি’ স্রেফ বস্তুগুণ মানুষের উপর আরোপ করা অন্যায় নয় কি? আপনিও অবশ্যই ভাল থাকবেন।

বি.দ্র. কৃষিকাজ কিন্তু অসৃষ্টিশীল নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে সৃষ্টিশীল এবং অর্থপূর্ণ কাজ কৃষি: তলস্তয় বলেছেন। আমি সামান্য অধম তলস্তয়ের এ পর্যবেক্ষণটিরে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। আমার সামান্য অভিজ্ঞতা আছে এ ব্যাপারে, ব্যাপারটি অনেকটা এরকম: আপনি প্রাণ সৃষ্টির মুহূর্তকে অনুভব করছেন। যখন নরোম ভেজা মাটিতে বীজ অথবা চারা রুয়ে দিচ্ছেন। রোয়া।

এই সম্পর্কিত আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতাটি পূর্বের একটা লেখা থেকে তুলে দিলাম:

…মহামতি তলস্তয়ের একটা ভাবনা পড়ে একবার বুক কেঁপে উঠলো আমার; যারা শস্যের উৎপাদনপ্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি সংযুক্ত না, তাদের কাছে জীবনের প্রকৃত অনুভূতি কখনো ধরা দেবে না। তাঁর কথাটা পুরো মনে না-পড়লেও এরকমই কাছাকাছি কিছু বলেছেন তিনি। আমি তখন ঘটনাচক্রে কিশোর-উত্তীর্ণ বয়সেই গ্রামে ফিরে এলাম একবার। বাবা ছিলেন সরকারী চাকুরে, অবসর নিয়ে গ্রামে চলে এসে অজীবন দূরে সরিয়ে রাখা গ্রাম আর কৃষিকে আপন করে নেওয়ার দ্বিধান্বিত চেষ্টায় লিপ্ত। গ্রাম তাঁকে আপন করে না কোনভাবেই, ধানের জমিও তার সাথে অপরিচিত অতিথির মতো আচরণ করছিল। কিন্তু বাবা মৃত্যুর আগে শরীরের সামর্থ যতদিন ছিল সাধনা করেছেন, জমির মন পেতে। অবসরের প্রথম দিকে, আমি তার সেই চেষ্টায় সহযোগি হয়ে বেশ কয়েক মাস থেকে গেলাম। আর ধান চাষের জমিতে রোয়া রোপনের চেষ্টা করলাম নিজে নিজে। পৃথিবীর সেই সুন্দরতম মধুর মহূর্তগুলোকে কোন সংজ্ঞা দেওয়া যাবেনা। আহ, সেই মুহূর্তগুলোর আনন্দময় অনুভূতি এত অসাধারণ যে, তখন কবিতাকে মনে হতো তুচ্ছ ব্যাপার। মনে হতো আমি একটি এত সজিব সৃষ্টি প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত, আর কোন কিছুর সাথেই তার তুলনা হতে পারে না। বুঝলাম, আমাদের পরিচিত শব্দ জীবন’বোধ’, যার থেকে বিবিধ কলা এবং সাহিত্য উৎসারিত, তা শহুরে মানুষের বুদ্ধিজীবীতা বা দর্শনের ব্যাপার, আর জীবন ‘যাপন’ ব্যাপারটি কৃষি কাজের সাথেই সম্পর্কিত। তবে মজার ব্যাপার হলো, কৃষক গোষ্ঠির কোন লোক যখন শহুরে মধ্যবিত্ত্বের মোটা বোধের আওতায় কিছু কথা বলে, আমরা অইটারে দর্শন বা অন্যবিধ শহুরে নাম দিয়ে বুঝতে চাই। কিন্তু, কথা হলো, ওদেরকে দার্শনিক হতে হবে কেন? দর্শন এবং এইসব ভীষণ কলা অস্থির চিত্তের অস্থিরতা। আমার মনে হল, এই জায়গা থেকে কবিতা, সাহিত্য গান শিল্পের নানান প্রকরণ এবং মানবিক তৎপরতাগুলিরে একবার সেচে দেখা দরকার।

এর একটা রজনৈতিক দিক এবং ক্ষমতাসম্পর্কও আছে। আমরা যেখানে বাস করছি, মূলত একটা কাগজের সভ্যতায়; যেটা স্রেফ কেরানিগিরি, মানে, কৃষকের ধনের হিশেবনিকেশ করেই এবং লুটপাট করেই তার সভ্যতাগিরিরে জিইঁয়ে রাখে। অথচ সেই সভ্যতায় কৃষকের কোন স্থান নেই। খাবার যোগায় কৃষক, খাবার উৎপাদন করে কৃষক, আমরা তার হিশাব নিকাশের শাস্ত্র দর্শন কবিতা সাহিত্য চিত্রকলা ইত্যাদি ফাঁপা জিনিশ শুধু ফলাই। আর কৃষক সেখানে নেই। এই যে না থাকা এবং ক্ষমতাকেন্দ্রে তাদের নাই হয়ে থাকা- এই বিষয়গুলির গুরুতর পর্যালোচনা দরকার।..

আদবের বরখেলাপ করে ফেললাম, নিজের লেখা থেকে লম্বা কোট করে ফেললাম। কিন্তু এই মুহূর্তে কথাটি আর আলাপের ভাষায় হাজির করার ধৈর্য হচ্ছে না। তাই কোট করলাম। মাফ করবেন।

 

দুই.

:: এই আলাপটি দুই হাজার চোদ্দ সালের জুনের শেষ নাগাদ। ব্রাত্য রাইসুর ওয়ালে হইছিল। শফিক শাহীন এবং ব্রাত্য রাইসু ছিলেন আলাপে। কবিতা, রাঙ্গালুর পেটিস পাঠ ও এক ঝাঁকি আম নামে একটি লেখা লিখছিলাম আমি। লেখাটি নিয়ে শফিক শাহীন অভিযোগ আনেন প্রচ্ছন্ন বিদ্বেষের। এমন কি রণজিৎ দাসরে কবি হিশেবে ছোট করার। সেই লেখার শেয়ারে::

 

শফিক শাহীন: ভালো লেখা, তবু, হেথায় প্রচ্ছন্ন বিদ্বেষটাই প্রকাশিত থাকিলো। কবিতার আলোচনায় কবিকে সাবলীল হইতে হবে, ইহা বাধ্যতামূলক নহে। কবিতা কী? তাহার কিংবা অন্যের কবিতা লিখার কারণ কিংবা ধরন কী হইতে পারে? আমি কী লিখিব? – এই জাতীয় সকল প্রশ্নের উত্তর দিয়া সেটিসফাই করিতে না পারিলে কবিকে তাহার কাব্য প্রতিভার ন্যায্য সম্মানটুকু প্রদর্শনে আপনাদের কেন এত কিপটামি, আল্লা মালুম।

ব্রাত্য রাইসু: কবির কিপটামি নিয়া বোধহয় বলছেন রিফাত।

শফিক শাহীন: এইটা কবির কিপটামি না, অস্বাচ্ছন্দ্য। রাইটিং-এ ভালো হইলে অরেটরিতে ভালো হইতেই হবে, এমন ভারসাম্যহীন দাবির তো সুরাহা নাই।

ব্রাত্য রাইসু: অরেটরিতে উনি খারাপ তো না, যখন আপনি নানা জায়গায় বক্তা তখন তো আর অরেটরির অস্বাচ্ছন্দ্য ধর্তব্য হয় না।

শফিক শাহীন: তা সত্য। অরেটরিতে উনি খারাপ না। আর অস্বাচ্ছন্দ্য কীসের তরে ঘটেছে তাও জানি না।

কারণ, কী ঘটছিলো সেখানে, এতোদূর হইতে তার হদিস পাওয়া মুশকিল, তাই রিফাতের লেখাতে যাহা প্রতিভাত হয়, পাঠকের কাছে তাহাই তাহা। সো, রিফাত যাহা বুঝাইলেন তাতে তিনি, মানে কবি সেখানে তেমন মনোযোগ পাইলেন না। এই মনোযোগ না পাওয়াটার কারণ রিফাত বলতে চেয়েও বলেন নাই। এই বলা না-বলার দ্বৈরথে থাকা প্রকাশের ক্ষেত্রে তাহার কিপটামি। অন্তত পাঠকের তরে। আমি সেই কিপটামিকে চিহ্নিত করতে চাইছি।

রিফাত কিছু অস্ফুট ইঙ্গিত দিলেন, বলেন নাই। কিপটামি করছেন, আর সেই না-বলায় যেন শুধু তাচ্ছিল্য প্রকাশ পাইলো। রাঙ্গালুর পেটিস আর আমের অবতারণা কবিকে তাচ্ছিল্য করিবার তরে, এইটুকু পরিস্কার। কিন্তু কেন? সেইটা ধোঁয়াশা। রিফাত পরিস্কার করবেন কি?

রিফাত হাসান: ‘প্রচ্ছন্ন বিদ্বেষ’> এইটা জাজমেন্টাল বক্তব্য। ‘রাঙ্গালুর পেটিস আর আমের অবতারণা কবিকে তাচ্ছিল্য করিবার তরে, এইটুকু পরিস্কার।’> এইটা অনুমানমূলক বক্তব্য। যা দার্শনিকভাবে সঠিক নয়। কারণ ‘রাঙ্গালুর পেটিস আর আমের অবতারণা’র একমাত্র সম্ভব কারণ ‘তাচ্ছিল্য’ আবিস্কার। এবং সেই অনুমানের উপর জাজমেন্ট। আর আর সব সম্ভাবনাকে বিনা বিচারে বাদ দিয়ে দেওয়া।

আমার লেখাটি জাজমেন্টাল না। কিছু প্রশ্ন বা বর্ণনা আছে। এই লেখাটার অনেক রকম পাঠ হয়তো সম্ভব, যদি খণ্ডিতভাবে পাঠে আগ্রহী হন পাঠকগণ।

তবে শফিক শাহীনের অভিযোগটি গুরুতর। বিদ্বেষ যদি সত্যিই থাকিয়া থাকে, আমি লেখাটি প্রত্যাহার করতেই স্বচ্ছন্দ হবো, বা লিখতাম না, কর্তব্য মনে করেই। আমি বিদ্বেষপ্রসূত লেখা লিখি না।

আমি কিপটামি নিয়াও কনসার্নড না।

এইটা একটা নিরাসক্ত বর্ণনা মাত্র। কিছুটা হিউমার দিয়ে লেখা। কারো কারো কাছে নিরাসক্তিরে বিদ্বেষ মনে হেইতে পারে, বিশেষত যিনি ভক্ত মানুষ। হোক না। সেইটা আমার কনসার্ণ না।

এবং এই লেখাতে রনজিৎ দাশ মুখ্য বিষয় না। যদিও ভদ্রলোককে কেন্দ্রে রেখেই আমার আলাপের শুরু। রণজিৎের কবিতা আমার ভালই লাগে। মোটামুটি। বা দুই হুজুরের বক্তব্যে (আরবী এবং ইংরেজি হুজুরের) আমার সমর্থন আছে, এমন সিদ্ধান্তও এই লেখাতে অসম্ভব। বরং এইটা একটা নোট বা নোক্তা হইতে পারে পরবর্তী যে কোন আলাপ শুরুর জন্য, যে, রণজিৎ দাশ শুধু না, যে কোন আধুনিক কবিতাকেই হুজুর থেকে শুরু করে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র পর্যন্ত কেন একই ভাবে ডিকশনারি মারা মনে করেন? বা আদৌএই ফালতু ‘ডিকশনারি মারা’ প্রশ্নে কবিদের ভাবিত হওয়া দরকার কি-না।- সেই আলাপ আসতে পারে। আমার বর্ণনায় এক বন্ধু ইংরেজি হুজুরকে গর্দভ বলছেন, কারণ সে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হইয়াই কবিতা বুঝে না এমন ফতোওয়া নিয়ে এসেছে। তবে আমি এই লেখায় এত প্রশ্ন আনি নাই। এইটা এক বিকেলের জার্নাল মাত্র। স্রেফ একটি চায়ের সাথে আলাপের মত।

কিন্তু এই লেখাটার একটা বড় প্রশ্ন যারা আমা থেকে বুঝিতে চাহেন, তাদেরে আবার কোট করি: ‘কবির কি নিজের প্রশ্ন বা বাহাস সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস থাকে না? বা তিনি ভাবধারায় শিশু, অস্পষ্ট, তাই কবিতা লেখেন?’

শফিক শাহীন: “জাজমেন্টাল বক্তব্য”, “অনুমানমূলক বক্তব্য”, “দার্শনিকভাবে সঠিক নয়”, “সকল সম্ভাবনাকে বিনা বিচারে বাদ দিয়ে দেওয়া” আপনার উপরোক্ত চারটি উপাত্তকে আপনার কঠিন ‘রায়’ ধরে নিলাম। ইংরেজিতে ‘জাজমেন্টাল’ বললাম না।

কেউ যদি লিখে- ফল, তো সেখানে একটি প্রশ্ন চলে আসতে পারে- কী ফল? আম নাকি জাম? উত্তর না পেলে যে কোনো ফল ধরে নেয়া জাজমেন্টাল হয় না, অনুমান ও প্রশ্নসূচক হইতে পারে। তবে সেই ‘অনুমান’ পঠিত বর্ণনার সমান্তরাল হইতে হবে। কীভাবে, তা লিখে দিচ্ছি।

“নিরাসক্ত বর্ণনা” যা “কিছুটা হিউমার দিয়ে লেখা” যে ব্যাপারটা, সেখানে রণজিৎ দাশ একজন সিম্বলিক আইটেম। কারণ, লিখেছেন- ” এই লেখাতে রনজিৎ দাশ মুখ্য বিষয় না। যদিও ভদ্রলোককে কেন্দ্রে রেখেই” আপনার “আলাপের শুরু।” অন্যদিকে এই প্রতীকী আইটেমের কবিতা “মোটামুটি” “ভালোই লাগে”। তবুও যাদের কবিতা ভালো লাগে তাদের তরেই এমন “নিরাসক্ত” জিজ্ঞাসার প্রস্তাবনা ‘নোক্তা’ হিসেবে রয়েছে (যা পরবর্তীতে আসতে পারে)- “রণজিৎ দাশ শুধু না, যে কোন আধুনিক কবিতাকেই হুজুর থেকে শুরু করে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র পর্যন্ত কেন একই ভাবে ডিকশনারি মারা মনে করেন? বা আদৌএই ফালতু ‘ডিকশনারি মারা’ প্রশ্নে কবিদের ভাবিত হওয়া দরকার কি-না।” সকল কবির তরেই এই প্রশ্ন আপনি রেখে যান।

দেখুন এখানে আপনার লেখার সাথে মিশ্রিত করা আমার সবকয়টা উক্তি সমান্তরাল হলো কিনা। যদি হয়, তবে তাকে আপনি জাজমেন্টাল বলবেন কেন? বরং পরিপূরক বলতে পারেন। ‘অনুমানমূলক’ হইলেও ‘দার্শনিকভাবে’ও বেঠিক নয়।

আমার “কিপটামি” শব্দের ব্যবহার আপনার লেখার মতন একটা ‘হিউমার’। যা আপনি স্বীকার করেছেন – “আমি এই লেখায় এত প্রশ্ন আনি নাই। এইটা এক বিকেলের জার্নাল মাত্র। স্রেফ একটি চায়ের সাথে আলাপের মত।” সো, অসম্পূর্ণ বর্ণনা প্রশ্ন জাগাতে পারে। আর সে প্রশ্নের উত্তর না পেলে পাঠের সাপেক্ষে যেটুকু ‘অনুমান করা যায় তাহা দোষের কিছু না।

‘বিদ্বেষপ্রসূত না’ বলছেন। কিন্তু আবার লিখছেন- “কবির কি নিজের প্রশ্ন বা বাহাস সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস থাকে না? বা তিনি ভাবধারায় শিশু, অস্পষ্ট, তাই কবিতা লেখেন?” কন্ট্রাডিকশন আছে না? আছে। আবার “ভাবধারায় শিশু”, “অস্পষ্ট” এইগুলি পুরোপুরি ‘জাজমেন্টালও’।

কিন্তু না, ওইগুলি রণজিৎ-এর রিফ্লেকশন। কারণ রণজিৎ বলেছেন ঐ টাইপের কথা। আপনি শুধু এমপ্লিফাইড করছেন। আমি জাজমেন্টাল মনে করি নাই। কোনো সম্ভাবনাকে নাকচ করি নাই।

রিফাত হাসান: আপনি সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। যথা: ‘হেথায় প্রচ্ছন্ন বিদ্বেষটাই প্রকাশিত থাকিলো’- । এইটা জাজমেন্ট। স্রেফ অনুমানসর্বস্ব।

শ্লেষকে যদি বিদ্বেষ বলেন, বলব এটি ভুল। কেননা, শ্লেষ কোন কোন সময় গুরু বিষয়। শ্লেষে আমার সমস্যা নেই। শ্লেষে হিউমার এবং ক্রিটিক থাকতে পারে। বিদ্বেষে কোন ক্রিটিক থাকে না, স্রেফ ব্যক্তিগত অপছন্দ বা ঘৃণা থাকে।

আপনার বক্তব্যের কোট: // ‘বিদ্বেষপ্রসূত না’ বলছেন। কিন্তু আবার লিখছেন- “কবির কি নিজের প্রশ্ন বা বাহাস সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস থাকে না? বা তিনি ভাবধারায় শিশু, অস্পষ্ট, তাই কবিতা লেখেন?”// এইটা ক্রিটিক্যাল অবস্থান এবং প্রশ্ন। বিদ্বেষ না। রণজিৎ দাশের কথার সাপেক্ষে।

 

তিন.

:: এই আলাপটিও প্রায় একই সময়ে। দুই হাজার চোদ্দ সালের জুনের শেষ নাগাদ বাংলা ওয়েব পোর্টালে হইছিল। ব্রাত্য রাইসুর সাথে। কবিতা, রাঙ্গালুর পেটিস পাঠ ও এক ঝাঁকি আম নামের লেখাটি বাংলা ওয়েব পোর্টালে প্রকাশিত হইছিল।::

ব্রাত্য রাইসু: রণজিৎ দাশের কবিতার সবই ডিকশনারির শব্দ না। বরং অন্য ডিকশদের চাইতে কম অভিধানময় উনি। কিন্তু যদি ডিকশনারি মার্কা শব্দাবলীও ব্যবহার করেন তার কাছ থেকে মাদ্রাসার হুজুর বা ছাত্র কি এই ধরনের পরামর্শ চাইতে পারে? এই চাওয়াটা জানতে চাওয়া হয় নাই, শ্লেষ হইছে। তেমন শ্লেষকারীর সঙ্গে রণিজৎ এর বাহাসে না যাওয়াটা মন্দ হয় নাই।

কিন্তু আমি বহুদিন হইল ওনার কবিতা আর পড়ি নাই। ওনার কবিতার ব্যাপারে আমার বিশেষণ: বড়োই উপদার্শনিকতাসুলভ!

রিফাত হাসান: রণজিৎ দাশের কবিতা মোটামুটি ভালই লেগেছে, যতটুকু পড়েছি। স্রেফ ডিকশনারির শব্দের বিষয়ে আমার ক্রিটিক্যাল অবস্থান নেই। সমস্যাও নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনি এইটারে আমার জন্য বিধান না কইরা দেবেন। বরং এইটা একটা নোট বা নোক্তা হইতে পারে পরবর্তী যে কোন আলাপ শুরুর জন্য, যে, রণজিৎ দাশ শুধু না, যে কোন আধুনিক কবিতাকেই আরবি হুজুর থেকে শুরু করে ইংরেজি সাহিত্যের হুজুর পর্যন্ত সবাই কেন একই ভাবে ডিকশনারি মারা মনে করেন? বা আদৌ এই ফালতু ‘ডিকশনারি মারা’ প্রশ্নে কবিদের ভাবিত হওয়া দরকার কি-না।- সেই আলাপ আসতে পারে।

দ্বিতীয়ত: পরামর্শ চাওয়া আর ফতোয়া বা জাজমেন্ট দেওয়া বোধ হয় এক না, আমি যদ্দুর বুঝি।

আমি আধুনিক কবিতা বুঝি না, ফলত এইটা ডিকশনারি দেখে লেখা হয়, এইটা এক ধরণের ফতোওয়া বা জাজমেন্ট। কিন্তু পরামর্শ চাওয়া ? মাদ্রাসার হুজুর যখন বলেন, যে, আমি রোজনামচা লিখি। সেই লেখার ভাষাটি কীরূপ হতে পারে, আমাকে ডিকশনারির শব্দ দিয়ে লিখতে হবে কি-না। আমার জানা মতে, যে কোন নতুন কবি যে লেখা শুরু করতে চায়, কিন্তু জানে না কী ভাবে শুরু করবে, সে যে কোন প্রবীণের কাছে ছন্দ, শব্দ, ভাষা নিয়ে অনেকটা এই ধরণের প্রশ্নই করেন। ধরুন, ইনি নতুন কবি, কোন রোজনামচা লেখক নন (যদিও রোজনামচা আর কবিতা দুইটা পাশাপাশি আলোচনাযোগ্য কি-না, প্রভেদ বা ক্যাটাগরি> এইসব ভিন্ন আলোচনার বিষয় হতে পারে) এই নতুন কবির প্রশ্নটি, আর আপনি যখন বলবেন, আমি আধুনিক কবিতা বুঝি না, ফলত বা কারণ এইটা ডিকশনারি দেখে লেখা হয়। দুইটা দুই অবস্থান।

আর, উভয়ের কাছে ডিকশনারির শব্দ ব্যাপারটিও বোধ হয় এক না। একজন আরবি হুজুরের ক্ষেত্রে, যদি হুজুরটি উর্দু বা আরবি মাধ্যমে পড়ালেখা করেন তার কাছে বাংলা যে কোন লেখাই প্রায় ডিকশনারির শব্দ হতে পারে। কিন্তু শুদ্ধ বাংলায় লেখার কাঙ্ক্ষা থাকতে পারে। যেহেতু এই বাংলা আধিপত্যশীল ভাষা। আর ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রের কাছে ব্যাপারটি সম্ভবত এত এলিয়েন না। বা হতেও পারে। আমি শিওর না। কিন্তু আপনি যখন বলেন, ‘এই চাওয়াটা জানতে চাওয়া হয় নাই, শ্লেষ হইছে। তেমন শ্লেষকারীর সঙ্গে রণিজৎ এর বাহাসে না যাওয়াটা মন্দ হয় নাই’- আপনি পরামর্শ চাওয়ার ব্যাপারে নির্বিচার জাজমেন্ট দিলেন।

রণজিৎ দাশ এই উভয় বিষয়ে বাহাসে অবতীর্ণ হবেন কি হবেন না, সম্ভবত এই সুযোগটিও পান নাই। বাহাসে যাবেন না, এই কথাটি রণজিৎ দাশ উভয় হুজুরের এক জনেরও উত্তরে কহেন নাই। বলেছেন চট্টগ্রামের এক কবির ভিন্নমত আছে বইলা কমেন্ট করায়। উনার বক্তব্য: ‘আমি আপনার সাথে বাহাস করতে আসি নাই। আপনার আর কোন প্রশ্ন আছে?’

ব্রাত্য রাইসু: তা ঠিক, হুজুর বা ছাত্রের ব্যাপারে বাহাসের প্রসঙ্গ আসে নাই। আমি ধইরা নিছিলাম।

কিন্তু ডিকশনারির ভাষায় উনি রোজনামচা লিখবেন কিনা এই প্রশ্নরে শ্লেষ ধরতে অসুবিধা নাই। অন্তত হুজুর বা ছাত্র যদি শ্লেষ নাও কইরা থাকেন আপনার রচনায় এই প্রসঙ্গের অবতারণা একটি শ্লেষ — হয়তো আপনারই শ্লেষ। হুজুররা হয়তো আপনারে শ্লেষ করার সুযোগ কইরা দিছে।

রিফাত হাসান: শ্লেষে যদিও আমার সমস্যা নেই। শ্লেষ কোন কোন সময় গুরু বিষয়। শ্লেষে হিউমার এবং ক্রিটিক থাকতে পারে। (আপনার কহিত) আমার এই ‘হয়তো’ শ্লেষটার বিচার খাড়া করা দরকার, যেহেতু প্রশ্ন তুলেছেন। রণজিৎ দাশ কবিতা কী- শিল্প কী- এমন আলাপ করছিলেন শুরুতে। এইটা গুরুতর আলাপ। কিন্তু রোজনামচার আলাপ কবিতার সাথে যায় না- তাই এই প্রসঙ্গ আসাটা শ্লেষ> আপনি যদি এমন মনে করেন, তাও গুরুতর আলাপের বিষয় বৈকি। রোজনামচা আর কবিতা দুইটা পাশাপাশি আলোচনাযোগ্য কি-না, প্রভেদ বা ক্যাটাগরি> এইসবই এই আলোচনার গুরু বিষয় হতে পারে। (উপরের কমেন্টেই এই নোট দিয়েছি।)

ব্রাত্য রাইসু: রোজনামচায় ডিকশনারি শব্দ ব্যবহার করা যায় কিনা — এই প্রশ্ন করলে তা কখন শ্লেষ এবং কখন শ্লেষ না এই রকম হাজারটা মুহূর্ত থাকতে পারে। কখনো শ্লেষ কখনো শ্লেষ না। সেই সব বিচার বাদ। আপনার উত্থাপনটুকু শ্লেষ।

রিফাত হাসান: হায়, আপনি বিচার বাদ দিয়ে ‘আপনার উত্থাপনটুকু শ্লেষ’ এই ভ্রমণ কেমনে শেষ করলেন? ইনটুইশন?

ব্রাত্য রাইসু:  বিচার হইল বোঝানোর কেরামতি। বুঝতে গেলে বিচার লাগে না, ইনটুইশনেও হয়। বিচারের বিপরীতে কেবল যে ইনটুইশেনরে আনলেন তাও শ্লেষমূলক জিজ্ঞাসাই। আপনারে যদি কেন এই আনাটা শ্লেষ তা বোঝানো লাগে সেই কাজে আমি নামনো না। কারণ এইটা অনিঃশেষ প্রক্রিয়া।

তর্কে আমি সংজ্ঞার্থ নির্ণয় করতাম না। বরং আপনি কীভাবে যে শ্লেষ করেন নাই, কীভাবে যে হুজুর বা ছাত্র শ্লেষ করে নাই তাই শোনার চেষ্টা করব। আপনার ধারণার ‘জাজমেন্টাল’ বক্তব্য হাজির করার মাধ্যমে। আমার বক্তব্য যে জাজমেন্টাল তা আপনার বিচার-আচার ছাড়াই জাজমেন্টাল তো হইতে পারতেছে দেখা যায়।

রিফাত হাসান: তর্ক অবশ্যই একটা অনিঃশেষ প্রক্রিয়া। আই থিঙ্ক সো, টু। কিন্তু বিচার শুধু বোঝানোর কেরামতি যদি হয়, তাইলে কোন জাস্টিস কোয়াশ্চেন থাকে না। আমি মনে করি, ইরেসপেকটিভ অব এনি ক্যারামতি, জাস্টিস কোয়াশ্চেন এক্সিসটস। (আলাপটা কোন দিকে গেল?)

 

চার.

:: এই আলাপটি বর্তমানে চলমান আমার ফেসবুক পোস্টে। কবিতা, রাঙ্গালুর পেটিস পাঠ ও এক ঝাঁকি আম- লেখাতে। আবার মজনু শাহের সাথে। মধ্যিখানে মনিকা চক্রবর্তী নামে একজনও মন্তব্য করেন। ::

মজনু শাহ: আপনার গদ্যভঙ্গি, চমৎকার। অনুষ্ঠানের একটা ছবি, উপস্থিত না থেকেও কিছুটা অনুমান করা গেল। এমন অনুষ্ঠানে, রেসিপি পাঠক, বিরল নয়। কবিতা শুনতে এসে ঘুমিয়ে পড়েছে, এমনও তো হয়। বা নিচুস্বরে অন্যগল্প করছে, সবই ঘটে।

কিন্তু এই ব্যতিক্রমগুলোকে হাইলাইট করলে হয় কী, সত্যি যারা শুনতে এসেছিলেন,কেউ কেউ হয়ত কিছুই জিজ্ঞাসা না করে শুনে যান কবিতাপাঠ,তাদের একটু হলেও অবজ্ঞা করা হয়। কারণ এঁরাই তো সংখ্যায় বেশি বলে অনুমান করি। কারণ, কোথাও কাব্যপাঠ হচ্ছে,এটা জেনে স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই আগ্রহী শ্রোতারা আসেন। দুচারটে রেসিপিপাঠক রঙ্গ দেখার জন্যে ঢুকে পড়ে কাহিল হবেন,এ তো বিচিত্র কিছু না।

কবিতা কী, যে কেউ এই প্রশ্ন করতে পারেন কবিকে। তবে কবি যদি এড়াতে চান এই প্রশ্নটির ফাঁদ, সেও হয়ত দোষের নয়। কবিতা কী, সত্যি কি একেবারে লাগসই উত্তর আছে এর? বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপকেরা অবশ্য বিস্তর সংজ্ঞা বলতে পারবেন। আজ যিনি লিখছেন,তার কাছে সেইসব সংজ্ঞা অতিক্রমের ব্যাপারও থাকে হয়ত। বা, যা অনুভবের জিনিস,তার মূল্যনির্ধারণ, দুরূহ।

কবিতা উপভোগ পেরিয়ে, শেষতক একঝাঁকি আমের প্রশস্তির দিকে গেছে লেখাটা। তা ভাল। কবিতার চেয়ে আমই যে অধিকতর সুস্বাদু,এই ব্যাপারে দ্বিমত নাই আমারো। শুধু ভাবাভাবির ক্ষেত্রে একটু দ্বিধা উপস্থিত হয়, দুইটা তো দুই রকমের উপভোগ!

আপাতত, কবিতা কী,তার অনুসন্ধান আম-বরাবর ভেবে দেখা যেতে পারে। রিফাত ভাইয়ের প্রতি আমার সামান্য চাওয়া, একঝাঁকি আম-উপভোগ তো হল,তায় রাজশাহীর আম! আচ্ছা,এখন বলেন দেখি —

আম কী?

বা, আম কাহাকে বলে?

আমার নিজের পছন্দ, কবিতা কী,এই অনুসন্ধানে না গিয়ে,কবিতা পড়তে থাকা। আম কী, এই সংজ্ঞা না খুঁজে গোটা কয় আম ঝটপট খেয়ে ফেলা।

মনিকা চক্রবর্তী: kobita upovoger bepar. r ta jodi Ronojit da’r kobita hoy tahole ta amar kache vari upovoggoy.choto choto kobita kintu osadharon! priyo kobider somalochona valo lagena,kobitatai valo lage, sathe kobikeo.

রিফাত হাসান: অাপনার ভাষা অধিকতরো মিষ্টি, উপভোগ্য। আপনার কবিতার মতো, ঝরঝরে। এইটা উপভোগ করতে আমাকে আপনার ভাষা সম্পর্কিত কোন রহস্য-গান করতে হয় নাই। মানে, এর গন্তব্য প্রশ্ন করা যাবে না, এইসব অকুল আলাপ।

‘এমন অনুষ্ঠানে, রেসিপি পাঠক, বিরল নয়।’

সত্য বটে। আম, রাঙ্গালুর পেটিস পাঠ এইসবের সাথে সাথে আমার ক্যামেরাগিরি এবং কবিতা শোনাও তো চলতেছিল। লেখাতেই বলেছি। এই ঘটনার মধ্যে খুব একটা অস্বাভাবিকতা নেই। এই ঘটনায় অস্বাভাবিকতা দেখানোর দুরভিসন্ধিও আমার নাই। এইটা তো কবিতার কোন সিরিয়াস আলাপ নয়, আমার ব্যক্তিগত জার্নাল। তাতে রন্ধনশৈলীর বই পড়তে যদি আমি কাউরে দেখি, তারে আমি গোপন করাটা নায্য মনে করি না। এই ঘটনাতে আমার কৌতুক বোধ হতেই পারে।

আবার যেমন ধরুন: আম, কবিতা দুই-ই উপভোগ্য। আমি মানি। কিন্তু ধরুন, আমি তো জানি আমের কী মাজেজা। বা আম যিনি বানান, অন্তত তিনি জানেন। বা কেউ যদি নাও জানেন, তাতে আম অনর্থ হয়ে যায় না। তার জন্য আপনি ঘোষণা দিতে পারেন না, আম অনর্থ, অস্পষ্ট গন্তব্য তৈরী করে।

আমার কথা হলো, কবি কি জানবেন না, কবিতার কী মোজেজা? কবি কি ঘোষণা দেবেন, কবিতার কোন গন্তব্য নেই? প্রশ্নটারে আরো সরলভাবে করি, উপরের লেখা থেকেই কোট নিয়ে: ‘কবির কি নিজের প্রশ্ন বা বাহাস সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস থাকে না? বা তিনি ভাবধারায় শিশু, অস্পষ্ট, তাই কবিতা লেখেন?’

রিফাত হাসান: priyo kobider somalochona valo lagena,kobitatai valo lage, sathe kobikeo.> সমালোচনা কার না ভাল লাগে, বলুন! সমালোচনায় অতীষ্ট হয়ে জীবনানন্দ দাশ সবচেয়ে ফালতু কবিতাটা লিখেছিলেন, প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে। ‘বরং নিজেই তুমি লেখ নাক একটি কবিতা’। এইটা যেহেতু ঝরঝরে লাইন, গন্তব্য বোঝা যায়, আপনি প্রশ্ন তুলতে পারেন বরং, এইটা আদৌ কোন কবিতা হল কি-না!

মজনু শাহ: প্রথম কথা হচ্ছে বাহাসে আত্মবিশ্বাসহীনতা না খুঁজে অন্যভাবে ভাবা যেতে পারে। সবাই হয়ত নন, কোনো কোনো শিল্পী তাঁদের শিল্পবস্তুতে নানারকমের মিনিং-এর পথ খুলে রাখেন কীভাবে তিনি সৃষ্টি করেন সেই গূঢ় সূত্রগুলো আড়াল করে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতাগুলো কী কী পরিস্থিতির মধ্যে সৃষ্ট হয়েছিল,সেসব তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলো একসঙ্গে করার সময় ছোট ছোট ভূমিকা দিয়েছিলেন। শঙ্খ ঘোষ দেখিয়েছিলেন,এইভাবে নিজের কবিতা নিয়ে নিজেই কিছু ব্যাখ্যা রেখে যাওয়াটা ভবিষ্যৎ-পাঠকের জন্যে ক্ষতির। কারণ,পাঠক তখন নিজের অভিজ্ঞতার নানা স্তর থেকে না দেখে, কবির প্রণালীতে ভাবতে থাকেন। আপনি যখন কবিতা রচনা করবেন,নিশ্চয় আপনি জানবেন,সেটা কী। যেমনটা, এক ঝাঁকি আম সাবার করার পরে আম কী,সেটা আপনি জেনেছেন, কিন্তু আম কাহাকে বলে যখন জিগাবো আপনাকে, তখন ফাঁপরের অন্ত নাই! দেখবেন উত্তর না দিয়ে খালি গাই গুই করছেন!

কবি ভাবধারায় শিশু বা অস্পষ্ট নন। কেবল অপরাপর বিদ্যাগুলোর মত করে কবিতাকে তিনি ভাবেন না হয়ত। দর্শন বা গণিতে, কোনো একটা বক্তব্য বা উপপাদ্যকে সুনির্দিষ্ট করে এগোতে হয়, নইলে উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। সুনির্দিষ্ট বক্তব্য নিয়েও কবিতা আছে জগতে,সেসবের বড় মুশকিল হচ্ছে, দু-এক পাঠেই ফুরিয়ে যায়।আবার, কবিতা এই সুনির্দিষ্ট অর্থের জগত বেশিভাগ সময় এড়িয়ে ইঙ্গিতময় থাকতে চায়। ইঙ্গিতময় বলেই,সেসব কবিতা যায় বহুস্তর মিনিং-এর দিকে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় স্পষ্ট আর গন্তব্যওয়ালা(আপনি কবিতার গন্তব্য নিয়ে ভাবিত দেখলাম!) কবিতা তো লেখা হয়েছিল অনেক, সেসব এরশাদের ক্ষমতাত্যাগের পর পরই ফৌত হয়েছে। আর, চর্যাগীতি ইঙ্গিতময় বলে আজও তার আবেদন ফুরাচ্ছে না পাঠকের কাছে…

No Comments Yet.

What do you think?

Your email address will not be published. Required fields are marked *