আমার নাস্তিকতা, মিথ্যা কথার বয়ান এবং একটি সাদা রঙের মেঘ

Untitled-1জোছনায় চন্দন কাঠের গন্ধ থাকে
আমার জানালায় একটি কামিনী গাছ ছিল। ছোট্ট একটি আকাশ, বরফির টুকরোর মত। ছিমনির ধোয়ায় ভরা, ময়লা, ঘোলাটে। কখনো দগদগে লাল, কখনো নিশ্ছিদ্র নীল। আমার সেই ছোটবেলায় কল্পনার মহাবিশ্ব। কখনোই ফুল ফুটেনি কামিনী গাছটাতে। আমি ভাবতাম, একদিন ফুল ফুটবে। কামিনী ফুলের গন্ধে নাকি সাপ আসে। আমি সাপ এবং সুন্দরের ভয়ে অস্থির হয়ে থাকতাম। জানালার পাশে একটি রাজার মতো চেয়ারে বসে, কোন এক দূর অচিন্তপূরের কথা ভাবতাম। পরে, আরো অনেক পরে, যখন পথের পাঁচালি পড়ি, তখন, আমি আমার সেই নিশ্চিন্দিপুরে বেড়াতে যাই। অপুর সাথে। দুর্গার সাথে। আমি প্রথম রেল লাইন দেখি সেই নিশ্চিন্দিপুরে।

ঝিক্ঝুমাঝুম ঝিক্ঝুমাঝুম রেলের গাড়ি
ঝিকঝুমাঝুম যায় বুঝি ও চাঁদের বাড়ি…

ছিমনির ধোয়ায় ভরা, ময়লা, ঘোলাটে আকাশ চন্দনকাঠের গন্ধে ভরে গেল একদিন। পুর্ণিমার রাতে। পূর্ণচন্দ্র। কী গভীর গহন জোছনারে বাবা। চন্দন কাঠের রঙ, গন্ধভরা। সেদিনই দিবসকালে কেউ যেন বলেছিল, এই রাত্রি ভয়ঙ্কর। কপিলাবস্তুর রাজপুত্রের মাথা খারাপ হয়েছিল এই রাত্রে। ছোটদের বেরুনো নিষেধ। আমি সেই রাত্রেই প্রথম চুরি করে বেরিয়ে নগরীর রাস্তায় একা একা হাঁটলাম। চন্দন কাঠের সৌরভ এবং রঙ গায়ে মেখে। একটি একলা জোনাকী কোত্থেকে যেন নগরীতে ঢুকে পড়েছিল, আমার পিছন পিছন চলছিল। পরের দিন বন্ধূদেরকে যখন বলি, জোছনায় চন্দন কাঠের গন্ধ থাকে, সবাই অদ্ভুত চোখে আমার দিকে তাকায়। বলে, মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আর জোনাকী? জোছনায় জোনাকী থাকে নারে বোকা।

কিন্তু আমি দেখেছি জোছনায় চন্দন কাঠের গন্ধ থাকে। আর জোনাকী থাকে। আর? আর বাবা থাকে। বাসায় ফিরার পর দেখি বাবার নিঃশব্দ জোনাকী। জ্বলে আর নিভে। উৎকন্ঠায়। বাবার জায়নামাজটা পেরিয়ে, মা যেখানে তসবিহতে বিভোর, তার পাশে বসে পড়ি আমি। চন্দন কাঠের গন্ধটা আমি তখন আরো গভীরভাবে টের পাই।

বাবার নীল মিউজিয়াম
বাবার একটি নীল মিউজিয়াম ছিল। আমরা ভাইবোনেরা সেই মিউজিয়ামের ভিতরে তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান আটটি প্রত্ন সম্পদ। প্রত্নতাত্বিক মমতায় আগলে রাখতেন আমাদের ভাইবোনদের। একটি হুইল চেয়ারে বসে বাবা চালাতেন তাঁর সাম্রাজ্য। তাঁর সবচেয়ে ছোট ছেলেটির জন্য কখনো খুঁজে আনতেন ছেঁড়া কুড়িয়ে পাওয়া কবিতার পাতা। তুই কি এরকম কবিতা লিখতে পারবি কখনো খোকা? ছোট ছেলেটি হাসতো। খুব গর্বভরা হাসি। তুমি কবিতার কী বুঝো বাবা? বাবাও হাসতেন।

বড় হয়েও, সেই হাসির অর্থ, মমতা, আমি বুঝতে অক্ষম। ভাবতাম, বুড়োটা কবিতার কী বুঝবে। আমরা আধুনিকতা পেরিয়ে উত্তরাধুনিকতায়, আমাদের ভাষাতো বুড়োদের বুঝার কথা নয়। আমরা মিশেল ফুকো পড়ছি, আর বাবা বলতেন কবিরা নাস্তিক। গল্প মানে মিথ্যা কথার বয়ান। আমরা ভাষার উলটপালট নিয়ে উত্তুঙ্গ ভাবছি, আর বাবা শেখ সাদি আর রুমির বয়াত শূনাতেন। আমি অস্থির হয়ে উঠতাম। বাবা ‘পন্দনামা’, ‘মান্তেকুত তায়েরে’র কথা বলতেন। আমি মনে মনে ভাবতাম, বুড়োরা তাই নিয়ে থাকো। উত্তরাধুনিকতা তুমি বুঝবে না। এখন কবিতা বুঝতে হলে, অস্তিত্ববাদ বুঝতে হবে। ফুকোর জ্ঞান ও ক্ষমতার তত্ত্ব বুঝতে হবে। ওরিয়েন্টালিজম, পোস্ট কলোনিয়ালিজম বুঝতে হবে। এবং দেরিদার ডিকন্সট্রাকশন জানার পর তুমি সাহিত্য বুঝবে। তুমি বরং প্রাগৈতিহাসিক রুমি আর শেখ সাদিরে নিয়ে থাকো। বাবা হাসতেন।

বাবার মিউজিয়াম নিয়ে আমার ভাবনার সময় ছিল না। পৃথিবীর তাবত দার্শনিক এবং রাজনৈতিক সমস্যা, কবিতার কোন নতুন বাঁক এবং ভাবনা, কমল মজুমদারের গল্পভাষা, ইলিয়াসের প্রায় রাবারের মতো লম্বা বাক্যগুলির বিষয়ে আমার ভাবনার অন্ত ছিল না। সংসার খুব বিতৃষ্ণার জায়গা যেন।

কিন্তু বাবা তাঁর সংসার মিউজিয়ামের প্রত্নসম্পদগুলোকে তাঁর হুইল চেয়ারের ধাতব অস্তিত্ব দিয়ে আগলে রাখতেন। আমরা বুঝতেই পারতাম না সংসার কী, দরকার হতো না। বাবার হুইল চেয়ার আমাদের সবকিছুকে স্বাভাবিক লালিত্য দিয়ে চলে যেত। এবং মাঝে মধ্যে বাবার হুইল চেয়ারের ধাতব চাকার শব্দগুলো আমাদের অস্তিত্বকে সচকিত করে দিত। কী বিপুল মৌন নৈঃশব্দ এনে দিত তাঁর শব্দেরা হঠাৎ হঠাৎ। আমার উল্লম্ফনের শব্দরা আচম্বিতে থমকে যেত! কী যে হয়!

অনিন্দিতাকে লেখা চিঠিগুলো এবং বাবার চিঠি
উনিশশো সাতানব্বই সালের কোন এক দিন। রাজার মতো চেয়ারটাতে বসে, আমার তখন কেবল কল্পতরুর হাট বসত মনে। কামিনী ফুলগাছটার পাশে জানালায় বসলেই কিছু চড়ুই পাখির কিচির মিচির শুনতে পেতাম। কী সব আলটপকা ভাবনায় জড়িয়ে থাকত মন। পড়া ভাল লাগত না। আল মাহমুদের সেই কবিতার মতো, আমি কেবলই ভাবতাম; ‘সবাই যখন পড়ছে পড়া মানুষ হওয়ার জন্য’, আমার তখন পাখি হওয়াই নিয়তি। ‘আমি না হয় পাখিই হলাম পাখির মতো বন্য’। মন কখনো চড়ুই পাখির সাথে উড়তো, আবার কখনো মধ্যরাতে জোনাই পোকার সাথে গভীর গহন অন্ধকারে। আমার মনের খবর সবাই জেনে গেছে, আমি লেখা পড়া করি না। আমিও। জেনে গেছি আমার ভিতরে একটি গভীর বিষণ্ণতরো জোনাক পোকা আছে। ওড়ে সারাদিন সারারাত। জ্বলে আর নিভে। তখন আমি আরো ঢের ছোট আর জেদী। এসএসসি পরীক্ষার্থী। পড়তে বসলেই বইয়ের ভিতরে লুকিয়ে অপু আর দুর্গার সাথে গল্প, পড়তে বসলেই কাগজ নিয়ে হরেকরকম আঁকিবুকি। ইতিমধ্যেই আমার অনেকগুলো বইয়ের সংগ্রহ ভাইয়াদের দ্বারা বাজেয়াপ্ত হয়েছে। এক অদ্ভুত মানুষের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে যার কাছে আছে অসাধারণ সব রাশিয়ান বইয়ের সংগ্রহ। কি অদ্ভুদ সব নাম, তলস্তয়, দস্তয়েভস্কি, গোগল, গোর্কী। তখন আমার বিকেলগুলো গোপনে রাশিয়ার কোন সুদূরের এক গ্রামে কাটিয়ে দিতাম, সন্ধ্যার শেষ ক্যারাভানটা বিদায় দিতে দিতে হলুদ সর্ষেক্ষেতের ওপারে হলুদ সূর্যটার অস্ত যাওয়া দেখতাম। লোকটি ছিল নিষিদ্ধঘোষিত একটি সংগঠনের রহস্যময়ী কর্মী। আমি গোপনে তার সাথে দেখা করতাম। সেই অদভুদ সময়টাতে, একদিন, বাবা গ্রাম থেকে আমাকে দেখতে এলেন। আমার পড়ার টেবিলে এসে বাবা হঠাৎ দেখেন আমি কিছু একটা লিখছি পড়া বন্ধ করে। বাবা সেই লেখাটা আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে চলে গেলেন। তখন আমার মন বড়ো অভিমান করে বসে রইল। আমার জেদ চেপে বসল। আমিতো স্মৃতি থেকে কবিতাটা আবার লিখে ফেলেছি, একদিন গুন্নি আপুকে বললাম। অক্টোবরের উন্ত্রিশ তারিখে ছোট ভাইয়ার মারফত বাবার লেখা একটি চিঠি পেলাম। চিঠিটা তখন পড়েছি বলে মনে পড়ে না। জেদ ছিল বলে। অথবা পড়লেও, একজন সাধারণ মানুষের চিঠির গুরুত্ত্ব ছিল না আমার কাছে হয়তো, তাই মনে থাকেনি।

আমরাতো অসাধারণ কিছূ হতে চলেছিলাম।

তারো অনেকদিন পর, অনিন্দিতার সাথে আমার পরিচয়। আমি নিজেকে বুঝতে শুরু করলাম অনিন্দিতাকে দিয়ে। অনিন্দিতার কাছে লেখা আমার চিঠিগুলো কখনো পোষ্ট করা হয়নি, সবগুলো আমার একটি পুরনো মিউজিয়ামে জমা আছে। অনিন্দিতা আমার চিঠির জবাব দিয়েছে, মনে পড়ে না। তারও নিশ্চয় আমার মতো একটি মিউজিয়াম আছে। আমাদের প্রতিদিন কথা হয়, প্রতি মুহূর্তে। এবং কখনো কখনো বিতর্ক হয়। অনিন্দিতার সাথে আমার কথাগুলো হয় নৈঃশব্দে। অনিন্দিতা আমার আয়না। অনিন্দিতাকে আমি ভালবাসি। অনিন্দিতা। হলুদ সর্ষেক্ষেতের ওপারে হলুদ সূর্যটা যখন অস্ত যায়, এই অমর দৃশ্য, তার সমূহ অর্থ এবং রাজনীতি, তার সাথে মানুষের যে অনেতিহাসের সম্পর্ক, সবকিছু আমি অনিন্দিতাতে পাই।

অনেকদিন পর, আজ হঠাৎ অনিন্দিতার কাছে লেখা আমার চিঠিগুলো খুলে পড়তে শুরু করলাম। হঠাৎ দেখি বাবার সেই চিঠি। একটি পুরনো কাগজে, চন্দন কাঠের গন্ধ আছে তাতে। এগার বছর পর, আজ ৩০ মার্চ ২০০৮-

‘দোয়াপর সংবাদ, খোকন থেকে জানলাম, তুমি আগে থেকে আরো বেশী সাহিত্য চর্চা করছ। সায়েদাও বলেছে তুমি নাকি আমি যা এনেছি তাহা আবার লিখে ফেলেছ। এটা কি তোমার জিদ না অভ্যাস। খারাপ অভ্যাস এবং জিদ দুইটাই হারাম। অতএব দুইটাই পরিত্যাগ কর অন্যথা তোমার জীবন অন্ধকার। টেষ্ট পরীক্ষার আগে থেকে তুমি পরীক্ষার জন্য তৈয়ার হও। ইনশাআল্লাহ তুমি কৃতকার্য হবে, ছাত্রজীবনে সাহিত্যচর্চা জরুরতমতো করতে হয়- যেন তুমি ভালভাবে ক্লাস পার হয়ে যেতে পার। এই সময় সাহিত্যচর্চা করলে সাহিত্যক হওয়া যায় না, হওয়া যায় নাস্তিক। অর্থাৎ তুমি কিছু নিয়ম কানুনের অধীন নয়। তোমার ইচ্ছামতন তুমি চলবে। তাই তুমি হবে নাস্তিক। সাহিত্য প্রত্যেক মানুষের দরকার। তাই প্রতিটা ক্লাসে সাহিত্য আছে। সাহিত্য মানুষকে সভ্যতা শিখায়। অসময়ে সাহিত্য করতে গেলে মানুষ অসভ্যতা শিখে। তাই সমাজে লাঞ্চিত হয়। এখনো সময় আছে তুমি লেখাপড়ায় মনোযোগ দাও। ইনশাআল্লাহ কৃতকার্য হবে। হিতাকাঙ্খী অনেকে আছে। এখানে আর লিখলাম না। ইতি আহমদুর রহমান, শোভনদণ্ডী, ২৯/১০/৯৭.’

আমার নাস্তিকতা, মিথ্যা কথার বয়ান এবং একটি সাদা রঙের মেঘ
২০০৬ সালের ১০ মে তারিখে খুব ভোরে আমাকে বাড়িতে যেতে হল। বাড়িতে পৌঁছুতে পৌঁছুতে দেখি সারা গ্রামটা চন্দন কাঠের গন্ধে ভরে গেছে। অথচ দিন। খূব রোদ পড়েছে। একটু সাদামতন মেঘ আমাদের বাড়ির উপর। বাড়ির পাশে জবা ফুল ফুটেছে। আমাদের গন্ধরাজ ফুলগাছ সাদা হয়ে আছে। হাস্নুহেনা গাছের নীচে সাদা ফুলফুটা ঘাসের চাদর, তার উপর বসে পড়লাম। চন্দন কাঠের গন্ধে আমি এমন বিভোর হয়ে গেলাম, আমার নাস্তিকতা আর মিথ্যা কথার বয়ানের কথা মনে পড়লো না। মা আমাকে ডাকলেন। আমি সাদা ফুল ফোটা ঘাসের চাদরে বসে আছি তবু। সাদা রঙের মেঘটা আস্তে আস্তে মসজিদের দিকে চললো। একজন আমাকে ধরে নিয়ে চলল। অনিন্দিতা। তারপরে সাদা রঙের মেঘটি যে কোথায় চলে গেল। আমি অনিন্দিতার হাত ধরে বসে থাকি, আমার নাস্তিকতা এবং মিথ্যা কথার বয়ান শুধরানোর জন্য।

দূরে হলুদ সর্ষেক্ষেতের ওপারে হলুদ সূর্যটা যখন অস্ত যাচ্ছে।

What do you think?

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

No Comments Yet.