শাহবাগের আজান

860343_10152579341130714_629124146_o

ছবি কৃতজ্ঞতা: মুনেম ওয়াসিফ। মুনেম ওয়াসিফের ফেসবুক ওয়াল থেকে। বিনা অনুমতিতে।

 

শাহবাগ যাবো, যেতে চাই, কিন্তু আমি যেখানে থাকি, তার থেকে শাহবাগের দূরত্ব অনেক।  সেই দূরত্ব ঘুচানো যেত, কিন্তু যে দূরত্বটি স্রেফ স্হানিক পরিমাপ দিয়ে ঘুচানো যাবে না, তা নিয়েই এই নোট।

 

১.

 

শাহবাগের আজান, শব্দটা আমি এভাবেই ব্যাবহার করছি।  আজান, মানে ডাক বা আহ্বান।  শাহবাগে জড়ো হওয়া তরুণদের এই ধর্মগন্ধযুক্ত শব্দ আহত করতে পারে, তবু আমি এ শব্দটিই ব্যবহার করলাম।  হাঁ, শাহবাগের আজান, সেটা কী? আমার মনে হয়েছে সেটা অস্পষ্ট, প্রচুর ধোঁয়াশায় ভরা, বিহ্বল, গন্তব্যহীন, আবার উদ্বেলিত, উচ্ছল, দ্রোহী, অনেকটা আরব বসন্তের উদ্ভ্রান্ত তারুণ্যের মতন, বা তার চেয়েও অস্পষ্ট, যার ফলে প্রেসিডেন্ট মুরসি ক্ষমতায় আসলো, সেই একই একনায়ক, একটা পরিবর্তিত, ইসলামি পোশাক পরা চেহারা নিয়ে।  এই শাহবাগ তারুণ্য, যারা নিজেদের সেক্যুলার বলেন, আবার একই সাথে এইটারে তাহরির স্কয়ারের সাথে তুলনা করে আমোদ বোধ করেন, তারা চমকে উঠতে পারেন।  তাহরির স্কয়ারের এই চরিত্রটি কি তারা ধরতে পেরেছিলেন? এই শাহবাগ তারুণ্যের ভাব ও ভবিষ্যৎ কী?

 

সেই একই নিম্নমধ্যবিত্ত জীবনের ক্ষোভ-সাধ-আহ্লাদসম্পন্ন- খুনী, অপরের অধিকার হরণকারী, ধর্ষকামী, আবেগী, অরাজনৈতিক, নৈতিক ও ভালো মানুষ, হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইতে গিয়ে হত্যা ও নির্মূল, ধরে ধরে জবাই করার, তাদের মাংস দিয়ে সকাল বিকাল নাস্তার কথা বলনেওয়ালা, দেশকে ভালবাসনেওয়ালা, আবার রাষ্ট্রের দালাল, একই সাথে প্রেমিকাকে ভালবাসেন ও এসিড দিয়ে ঝলসে দেন, সেই একই ফ্যাসিবাদী ও সুবিধাবাদী ভাল মানুষ চরিত্র, যা একজন শিবির কর্মী থেকে ব্যতিক্রম নয়, ওরাও তাই করে থাকে সচরাচর।  মিছিলে, সমাবেশে, জীবন-যাপনে।  কিন্তু ওরা এখানে সংখ্যালঘু, তাই ওদের মিডিয়া কভারেজ নেই।  মিডিয়াতে ওদের ডেমনাইজ করা হয়, বিপরীতে শাহবাগের ফ্যাসিবাদকে হিউম্যানাইজ করা হচ্ছে।  আমরা এতে উদ্বেলিত হচ্ছি, মিডিয়ার সাথে।  সুমন গান লিখছে।

 

শাহবাগের যে আজান, তা আমার কাছে রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরে ফ্যাসিবাদের যে বিকাশ হয়েছে, তাই জানান দেয় রূঢ় স্বরে।  মিডিয়া, সামাজিক গণমাধ্যমের একটিভিস্ট, তাদের সহযোগে সব ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ছে এই ফ্যাসিবাদ।  আবার, একই সাথে এর আবেগ, সংহতি ও উচ্ছ্বাসের যে ভাব, তা আমার তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়।  তাই এর গন্তব্য ও পরিণতি সম্পর্কে সজাগ থাকা, এর সম্পর্কে প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা হাজির করা- এইসব আমাদের রাজনৈতিক কর্তব্যও বটে।

 

২.

 

প্রেক্ষিতটা হলো, বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ, বা তার আইনি নাম মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার-প্রক্রিয়া চলছে।  এমন একটি আবহের ভেতর দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি পরোক্ষভাবে এবং তার সহযোগী ইসলামপন্হী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামি ও ছাত্র শিবির প্রত্যক্ষভাবে এই বিচারের প্রতি অনাস্হা প্রকাশ করেছে।  জামাতের সিংহভাগ নেতৃত্ব এই অভিযোগে বিচারের জন্য গ্রেফতার হয়েছেন, স্বভাবতই জামায়াত শিবির এই ট্রাইবুনাল বাতিলের দাবিতে মিছিল-হরতাল এইসব করছে।  পুলিশ মিছিলে গুলি করেছে ও হত্যা করেছে শিবির কর্মীদের।  উল্টো দিকে শিবির কর্মীরা পুলিশের উপর হামলা চালিয়েছে।  তাদের এই কর্মকাণ্ড বিষয়ে বিচারের সমর্থকদের একটি গ্রুপ, ব্লগ ও সোসাল মিডিয়ার একটিভিস্টরা এবং সরকারের মন্ত্রীরা কিছুদিন আগেও কাতর প্রশ্ন তুলেছিলেন: যে, এইটা রাষ্ট্রদ্রোহিতা।  একটি বিদ্যমান রাষ্ট্র ব্যবস্হা ও তার সংবিধানের অধীনে গঠিত বিচার ব্যবস্হাকে না মানার এমন ঘোষণা বা তার বিরুদ্ধে মুখ খোলার ঔদ্ধত্যের কারণে জামায়াত শিবির নিষিদ্ধেরও দাবি তুলেছিল তারা।  এই দাবি ট্রাইবুনালের প্রতি এমন এক আস্হা থেকে তৈরি হয়েছে, যেই নিরঙ্কুশ আস্হার কারণেই সেই একই আদালতের প্রতি জামায়াত শিবিরের অনাস্হা।  স্কাইপি ক্যালেঙ্কারির পর এই অনাস্হা প্রকাশ করার সুযোগ আরো বেড়েছে।  এই ধরণের সুযোগ যে কেউ নেবে, আওয়ামী লীগ- বিএনপি প্রমুখ রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদীরা পর্যন্ত।  এর পেছনে জামাতের কোন রেডিক্যাল, রাষ্ট্রবিরোধী অবস্হান নেই।  কারণ জামায়াত শিবির এমন কোন বিপ্লবী দল নয়, যারা বিদ্যমান রাষ্ট্র ও বিচার ব্যবস্হাকে অস্বীকার করে নতুন ব্যবস্হা কায়েমের রাজনীতি করে।  দৃশ্যত ও কার্যত তা মনে হয় না।  বরং তাদের রাজনীতির সাথে বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্হার যেটুকু অসংগতি ও বিরোধ, তা দূর করতে দলীয় গঠনতন্ত্রের ন্যূনতম সংশোধন করাসহ সমভব সব উদ্যোগ নিয়েছে এই সংগঠন, বিভিন্ন সময়।  জামায়াত শিবির রাষ্ট্র বিরোধী, এই ধানাই পানাই দিয়ে যারা জামায়াত রাজনীতি ও যুদ্ধাপরাধ মোকাবেলা করতে চান, তাদের জন্যই এই নোকতা।  সাথে এই কথাটি পরিষ্কার করতে চাই, নিশ্চয়ই যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবি সুনির্দিষ্টভাবে আওয়ামীলীগ, বিএনপি বা কোন দলীয় দাবি হতে পারে না।  বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালে যারা এদেশের মানুষের উপর গণহত্যা ও নির্যাতন করেছে, তাদের বিচারের প্রশ্নটি আমাদের সবার কাছে দ্ব্যর্থহীনভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ একটি মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াই চালিয়ে যাওয়া।  এই প্রশ্নটি এড়িয়ে গিয়ে নয়, বরং এই প্রশ্নটি সামনে রেখেই, এবং এই প্রশ্নটির সাথেই আমাদের আলোচনাগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।  শাহবাগের উচ্ছ্বাস ফ্যাসিবাদের বিকাশ ঘটাচ্ছে, এই বাস্তবতার সাথে সাথে এটাও পরিষ্কার যে, যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রশ্নটি অমীমাংসায় রেখে আওয়ামী লীগ বিএনপি জামায়াত সহ আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো এতদিন যে দলীয় দুরভিসন্ধি ঘোট পাকিয়ে রেখেছে, তার অবসান চায় এরা।  যদিও তাদের প্রশ্নটি পরিষ্কার নয়, গন্তব্য ধোঁয়াশায় ভরা, কিন্তু তাদের আবেগটি মিথ্যা নয়।

 

৩.

 

শাহবাগের এই তারুণ্য সর্বসম্প্রতি জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার বিচারে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনাল কর্তৃক দেয়া রায়ে ক্ষুদ্ধ এবং ব্যাথিত।  তারা ফাঁসির রায় চান।  তারা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের নির্মূল চান, জামায়াত রাজনীতির নিষিদ্ধ করতে চান, এইসব আরো আরো কিছু।  যেমন, কেউ কেউ বলছেন, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধটাও তাদের অন্যতম দাবি।  শুধু তাই নয়, গতকালকের ঘোষণায় দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন গণ-মাধ্যম নিষিদ্ধেরও দাবি করছে তারা।  এই তারুণ্যকে কারা নেতৃত্ব দিচ্ছে, ছাত্রলীগ, বাম, গণতান্ত্রিক-অগণতান্ত্রিক ফ্রন্ট বা শিবির এইটা আলাদাভাবে বিবেচ্য নয়, বিবেচ্য হলো ওদের দাবি বা কাঙক্ষা।  সেটা কী? একটি বিচারিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ওদের পছন্দের রায় প্রদানের জন্য চাপ প্রয়োগ ও দাবি।  বিচার নয়, ফাঁসির দাবি।  অপরাপর দাবিগুলো এর সাথেই সংশ্লিষ্ট।  কিছুদিন আগেই ‘রাষ্ট্র বিরোধী ও ট্রাইবুনাল মানে না’, এই ধানাই পানাই দিয়ে যারা জামায়াত রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তুলছিলেন সেই একই রাজনীতিক বুদ্ধিজীবী মহল এদের এডভোকেট এখানে।  তাহলে কী দাঁড়াল? প্রথমত আইনি ভাবে মোকাবেলার চেষ্টা, রাষ্ট্রদ্রোহিতা, আইন ব্যবস্হা বা বিদ্যমান বিচার ব্যবস্হা অমান্যের অভিযোগ, জামায়াত নিষিদ্ধকরণের দাবি।  পরে আইনি পদ্ধতিতে নির্মূল সাধন, মানে চূড়ান্ত শাস্তির রায় না পেয়ে এখন সেই একই বিচার ব্যবস্হার প্রতি রাজনৈতিক চাপ।  বিচারের পরিবর্তে কালচারাল এক্সপ্রেশন, মঙ্গল প্রদীপ, ঢোল-তবলা, গান, নিষিদ্ধ ও ফাঁসি চাওয়া, এইসব।  বিচার এবং নির্মূল দ্বৈত চরিত্রের।  যারা নিষিদ্ধ চান, ফাঁসি চান, জবাই করতে চান, নির্মূল চান, তারা একই সাথে বিচার চাইতে পারেন কি? এই দুমুখো ভাষ্যের গণ্ডগোলটি হলো, আপনার কাছে স্পষ্ট না, আপনি এই আপদকে কীভাবে মোকাবেলা করতে চান- আইনি, নাকি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ায়? তাই এটি শেষেমেষ না আইনি না রাজনৈতিক গুরুত্ব পায়, অবশেষে একটি সুবিধাবাদী ও আওয়ামী ঘোট পাকানো চরিত্র হিশেবে হাজির হয়।  আবার দেখা যাচ্ছে তাদের কাছে স্পষ্ট না, তারা কি জামায়াত রাজনীতি ও ইসলামি রাজনীতির বিচার চায়, নাকি মানবতা বিরোধী অপরাধেরই বিচার চায়? এখানে সবার কণ্ঠস্বর আওয়ামীলীগের দলীয় কর্মসূচিতে লিন হয়ে গেছে।  এবং শেষে এসে থেমেছে জামায়াত রাজনীতির বিচারে, যুদ্ধাপরাধের বিচার হনুজ দূর।  কিন্তু জামায়াত রাজনীতির বিচার, সে আপনার ঘোরতর রাজনৈতিক মোকাবেলার ব্যাপার, আইন দিয়ে একে মোকাবেলা করার চেষ্টাটাই জামাতের কাছে আপনার রাজনৈতিক পরাজয়, তারা এটুকু মানতে নারাজ।

 

৪.

 

স্কাইপি ঘটনার পর, জামায়াত ঘোষণা দিয়েছে, তারা এই ট্রাইবুনাল মানেন না।  জামায়াতের ট্রাইবুনাল মানি না- এই অবস্হান ও দাবি শাহবাগ তরুণদের ট্রাইবুনালের কাছে রায় পরিবর্তন করে ফাঁসির আবদার এর চেয়ে মৌলিক এবং অভণ্ডামিপূর্ণ।  একই সাথে ট্রাইবুনালকে মানা এবং তার কাছে নির্দিষ্ট কোন রায় চেয়ে ডিকটেশন দ্বৈততাপূর্ণ ও ভণ্ডামি নির্দেশ করে।  এটি মূলতই ট্রাইবুনালকে অমান্য করার, এর প্রতি অনাস্হা ও বিচারকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার অভিযোগকে সুসংহত করে, যাতে বিচার বিরোধীরাই শেষ মেষ লাভবান হবে।  এই দাবির উদ্দেশ্য ও ফলাফল বিষয়ে তাই আমাদের গভীরতর সন্দেহ আছে।

 

৫.

 

আমরা বরং আর একটু ঘুরিয়ে দেখি।  আমরা আগেই বলেছি, যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবি সুনির্দিষ্টভাবে আওয়ামীলীগ, বিএনপি বা কোন দলীয় দাবি হতে পারে না।  বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালে যারা এদেশের মানুষের উপর গণহত্যা ও নির্যাতন করেছে, তাদের বিচারের প্রশ্নটি আমাদের সবার কাছে দ্ব্যর্থহীনভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ একটি মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াই চালিয়ে যাওয়া।

 

তাহলে যুদ্ধাপরাধের বিচারের মত একটি গুরুত্ত্বপূর্ণ দাবির এই অবস্হা হলো কেন? কেন এই দাবিতে সরকারি দল- বিরোধী দল সবার মধ্যে একটি গণ-আস্হার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা হলো না।  এমন কি, দরকার ছিল, জামায়াত-শিবিরের সমর্থকদের মধ্যেও এই বিচারের প্রতি আস্হা ও সম্মতি তৈয়ার করা।  ‘শিবিরের ছেলেরা যুদ্ধাপরাধী প্রজন্ম নয়, তারা স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভেতরে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্ম’: বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (কয়েকদিন আগেও কোন এক সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথ অনুষ্ঠানে) ও আওয়ামীলীগ নেতা শামসুল হক টুকু এমন কথা উচ্চারণ করেছেন, বেশ কয়েকবার, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে।  তাহলে প্রশ্ন হলো, মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী প্রজন্মের এই ছেলেরা কেন যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর আন্দোলন করতে যাবে? আমরা আগেই জেনেছি, শিবিরের ভেতরেও একটি গ্রুপ ৭১ সালে জামায়াত এর অবস্হান এবং যুদ্ধাপরাধ বিষয়ে একটা মীমাংসা চায়, যার কারণে তারা দল থেকে পদত্যাগ করেছিল।  এতদসত্ত্বেও সেই একই ছাত্র-যুবকরা কেন এই যুদ্ধাপরাধ বিচারকে মেনে না নিয়ে রাস্তায় নেমেছে।  আমরা কেন তাদের এই সমর্থন ব্যবহার করতে পারি নাই, বরং ঘৃণা ও অপরাপর নির্যাতনে তাদেরকেও যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রতিপক্ষ হিশেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছি?

 

আমার বিবেচনা হল, প্রশ্নটি যুদ্ধাপরাধ বিচারের প্রশ্ন হিশেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যর্থ হয়েছে আওয়ামীলীগ এবং এই বিচারের অপরাপর এডভোকেটরা।  বরং এই বিচারকে জামায়াত রাজনীতি, এমন কি ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, আরো সহজ অর্থে ‘ইসলামি রাজনীতি’র বিচার, যেইটারে উনারা মৌলবাদী রাজনীতি আখ্যা দিয়ে গালাগালি করে থাকেন এবং আজকের শাহবাগ তারুণ্য শেষমেশ যেই ইসলামি রাজনীতি নিষিদ্ধের কথা বলে বেড়াচ্ছেন- রাষ্ট্রযন্ত্র, আওয়ামী বুদ্ধিজীবী মহল ও এটির পক্ষের তাত্ত্বিকরা – ওইটারই বিচার হিশেবে হাব-ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।  স্বভাবতই মিডিয়া ও শাহবাগের কতিপয় তারুণ্যের বাইরে আর কোথাও এমন বাসনার গণভিত্তি নেই।  বিভিন্ন সময়ে এ সরকারের মন্ত্রীরা বলার চেষ্টা করেছেন, এটি প্রতীকী বিচার।  তো, জামায়াত-শিবির-বিএনপির ভেতরে যারা যুদ্ধাপরাধ বিচারের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে চান, এই বিচারের প্রয়োজন অনুভব করেন, কিন্তু দেখেন যে, ওই প্রতীকী বিচার স্রেফ জামায়াত রাজনীতিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েই সমাধা হতে যাচ্ছে, গ্রেফতার হচ্ছে স্রেফ জামায়াত নেতৃত্বই, তখন তারা নতুন করে ভাববেন বৈকি।  আবার, প্রথম রায়ে জামায়াতকে একটি যুদ্ধাপরাধী সংগঠন হিশেবে উল্লেখ করে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে ট্রাইবুনাল, কিন্তু কার্যত ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সংঘটিত সামগ্রিক যুদ্ধাপরাধের কোন বিচারিক পর্যবেক্ষণ হাজির করেন নাই এই রায়ে।  এমনকি যুদ্ধপরবর্তী সময়ে মুজিব সরকারের বাঁচিয়ে দেওয়া চিহ্নিত ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর ব্যাপারেও কোন কথা নেই।  প্রতীকী বিচারই যদি হতো, সেই ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীরও প্রতিকী বিচার হতে পারত, কিন্তু সেটা হয় নাই।  কেন? এই প্রশ্নটি কি আজকের শাহবাগ তারুণ্য করেছে কখনো? শাহবাগ তরুণরা জামায়াত শিবির নির্মূলের ঘোষণা দিচ্ছে।  জামায়াত শিবিরের বিশাল সমর্থক গোষ্ঠীকে স্রেফ নিকেশ করে দেওয়াটাই যুদ্ধাপরাধ বিচারের কাজ- এটাই কি ওরা মনে করেন? এই ফ্যাসিবাদী চিন্তার উৎস কোথায়?

 

৬.

 

আমি শাহবাগ যেতে চাই, কিন্তু দূরত্বটি প্রচুর।  আমাকে যাওয়ার পথে এইসব পর্যালোচনা করতে করতে হাঁটতে হয়।  আমি যেতে চাই, কিন্তু কোথায় যাবো?

 

What do you think?

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

No Comments Yet.